নগরীতে ‘অবাধ্য’ কিশোরীর হত্যাকারী মা-বাবা!

মা গ্রেফতার, বাবার খোঁজে অভিযান
মা-বাবা’র রহস্যময় আচরণই তথ্য উদঘাটন
হত্যাকা- নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য
স্টাফ রিপোর্টার : নগরীর নিরালা প্রান্তিকা আবাসিক এলাকা থেকে উদ্ধার হওয়া বস্তাবন্দি কিশোরীর পরিচয় শনাক্ত করেছে পুলিশ। নিহত আরফানা হোসেন নির্জনা (১৬) খুলনা ইকবালনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী। তিনি সোনাডাঙ্গা মডেল থানার বসুপাড়া বাঁশতলা এলাকার বাসিন্দা মো. আলীম হোসেন আকাশেরর মেয়ে।
এদিকে, স্কুল ছাত্রী নির্জনাকে তার জন্মদাতা পিতা এবং গর্ভধারীনি মা-ই নিজ হাতে হত্যা করেছে বলে পুলিশের কাছে প্রাথমিক প্রমাণ এসেছে। যে কারণে ইতিমধ্যেই তার মাকে নির্জনা হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন তার মা। আর বাবাকে গ্রেফতারের জন্য পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় খুলনা থানার এসআই লাভলী রাণী পাল বাদি হয়ে হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম।
খুলনা সদর থানার সেকেন্ড অফিসার এসআই মো. সাত্তার শুক্রবার (১০ জুলাই) বিকেলে জানান, নিহতের মা সীমা আক্তারকে আটক দেখানো হয়েছে। তবে নিহতের বাবা আলীম হোসেন আকাশকে এখনও পাওয়া যায়নি। তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
পুলিশ জানায়, বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রকাশিত সংবাদ দেখে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে গিয়ে মেয়ের মরদেহ শনাক্ত করেন তার মা।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) পুলিশের একটি বিশেষ চৌকস ইউনিট আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় নিহতের পরিচয় নিশ্চিত করেছে। তবে পরিচয় মেলার পরপরই এই হত্যাকা- এক চাঞ্চল্যকর ও রহস্যজনক মোড় নিয়েছে। ঘটনার পর থেকেই নির্জনার পিতা মো. আলীম হোসেন আকাশ এবং তার স্ত্রী আরিফা ইয়াসমিন সীমা আত্মগোপন করেন। হঠাৎ করে বাবা-মায়ের এমন রহস্যজনক অন্তর্ধানের পর খোদ পুলিশের মনেই নানা প্রশ্ন ও সন্দেহের উদ্রেক হয়।
অনুসন্ধানে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, এক যুবকের সাথে প্রেমের সম্পর্ক ধরে গত তিনদিন আগে বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছিল স্কুলছাত্রী নির্জনা। গত পরশু আকাশ ও সীমা দম্পতি অনেক খোঁজাখুঁজির পর নির্জনাকে প্রেমিকের কাছ থেকে উদ্ধার করে বাসায় ফিরিয়ে আনেন। কিন্তু বাসায় ফেরার পর থেকেই নির্জনা চরম বেসামাল ও অনিয়ন্ত্রিত আচরণ করতে থাকে। এ কারণে লাঠি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করা হয়। আর ওই আঘাতেই তার মৃত্যু হয়। ফলে ঘটনাটিকে ধামাচাপা দিতেই লাশ বস্তবন্দী করে নিরালা প্রান্তিকে তার খালার বাসার সামনে ফেলে দেওয়া হয়। পরিবারটি মাদকাসক্ত ছিল বলে প্রতিবেশিরা অভিযোগ করেছেন। তবে, মা-বাবা’র একমাত্র মেয়ে হয়ে বাড়ি ছেড়ে তাদের অমতে বিয়ে করায় অবাধ্য মেয়েকে শাসনের উদ্দেশ্যেই আঘাত করা হলেও মেরে ফেলার উদ্দেশ্য ছিল না বলে সূত্র দাবি করেছে।
এরপরই গত বুধবার রাতে তার বস্তাবন্দী রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার হয় এবং আজ থেকে তার বাবা-মা উধাও হয়ে যান। এই ঘটনার পর সচেতন মহলে প্রশ্ন উঠেছে-এটি কি পরিবারের ‘অনার কিলিং’ বা লোকলজ্জার ভয়ে নিজেদের হাতেই হত্যাকা-, নাকি এর পেছনে প্রেমিকের কোনো হিংস্র থাবা রয়েছে?
এর আগে, গত বুধবার (৮ জুলাই) রাত সাড়ে ৯টার দিকে নিরালা প্রান্তিকা আবাসিক এলাকার ৩ নম্বর সড়কের একটি সাততলা ভবনের সামনে পরিত্যক্ত অবস্থায় একটি বড় প্লাস্টিকের বস্তা পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বস্তা থেকে তাজা রক্ত বের হতে দেখে পুলিশে খবর দেওয়া হলে, খুলনা থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে বস্তাবন্দী অবস্থায় নির্জনার মরদেহটি উদ্ধার করে। সুরতহাল শেষে ময়নাতদন্তের জন্য লাশ খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
খুলনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, প্রথমে নিহতের পরিচয় জানা না গেলেও পরে তাকে নির্জনা হিসেবে শনাক্ত করা হয়।
তিনি বলেন, এ ঘটনার পর নির্জনার মা থানায় এলে তাকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। হত্যাকা-ের রহস্য উদঘাটনে পুলিশ কাজ করছে এবং শিগগিরই ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। আমরা অভিযানে আছি। এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত তথ্য না দিয়ে আজ শনিবার কেএমপি’র সদর দপ্তরে প্রেস ব্রিফিংয়ে পুরো ঘটনা জানানো হবে বলে উল্লেখ করেন।



