সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশোধন জরুরি

সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সাইবারজগতে অপরাধ। দিন দিন নতুন প্রযুক্তি যেমন আসছে, তেমনি বদলে যাচ্ছে অপরাধের ধরনও। এই পরিস্থিতিতে পাস হওয়ার মাত্র তিন মাসের মাথায় আবারও ‘সাইবার সুরক্ষা আইন’ সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। উদ্দেশ্য একটিইÑসাইবার পরিসরে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনা। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদ-সহ ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদ-ের মতো কঠোর বিধান রাখা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে অনলাইন দুনিয়ায় কী না হচ্ছে! ব্যক্তিগত আক্রোশ, ব্ল্যাকমেইলিং অথবা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য প্রযুক্তিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে এক শ্রেণির অপরাধী। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে মুহূর্তেই একজনের বিকৃত ছবি ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। চরিত্র হনন করা হচ্ছে। গুজব তৈরি করে হামলা ও সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের তথ্য বলছে, বর্তমানে প্রাপ্ত মোট অভিযোগের মধ্যে ৪৫.৫২ শতাংশই অনলাইন প্রতারণা। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে অনলাইন হয়রানি, যার হার ২৯.১৪ শতাংশ। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যাকাউন্ট হ্যাকিংয়ের অভিযোগ ৬.১৪ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এমন অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশোধন প্রয়োজন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের সূত্রের বরাত দিয়ে গতকাল দেশের কয়েকটি গণমাধ্যম জানিয়েছে, সংশোধনীতে ‘গুজব’, ‘অপতথ্য’, ‘হেয় প্রতিপন্ন’ ও ‘মানহানি’Ñএই চারটি শব্দকে অপরাধের সংজ্ঞায় আনা হয়েছে। এ ছাড়া আইন বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় নিরাপত্তা বাহিনীর পাশাপাশি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং ক্ষমতাপ্রাপ্ত সংস্থাকে যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। গুজবের সংজ্ঞায় বলা হয়Ñএমন কোনো অসমর্থিত বা অযাচাইকৃত তথ্য, সংবাদ বা দাবি, যা জনমনে বিভ্রান্তি, আতঙ্ক, উত্তেজনা বা সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করে অথবা অস্থিরতা তৈরি করার ঝুঁকি থাকে। অপতথ্য হলো এমন কোনো মিথ্যা, বিকৃত বা বিভ্রান্তিকর তথ্য, যা ব্যক্তি, জনসাধারণ, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রকে বিভ্রান্ত, প্রতারিত বা ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রকাশ বা প্রচার করা হয়। এ ছাড়া এআই ও ডিপফেক প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে অডিও, ভিডিও, স্থিরচিত্র, গ্রাফিকস কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি কোনো কনটেন্টের মাধ্যমে কাউকে হেয় প্রতিপন্ন বা মানহানি করা হলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদ- বা ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদ-ের বিধান রাখা হয়েছে। বর্তমান সময়ে সাইবার সুরক্ষার বিষয়টি সবার জন্য অপরিহার্য। একই সঙ্গে বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীলও বটে। অতীতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে অনেক বিতর্ক ছিল। বিশেষ করে সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী ও সচেতন নাগরিক সমাজে এ নিয়ে উদ্বেগ দেখা গেছে। অভিযোগ ছিল, সাইবার অপরাধ দমনের নামে স্বাধীন মত প্রকাশ, সাংবাদিকতা এবং ভিন্নমত দমনে আইনের অপপ্রয়োগ করা হয়। সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়্যারনেস ফাউন্ডেশনের সভাপতি কাজী মুস্তাফিজ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশে আইনের অভাব নেই, অভাব শুধু কার্যকারিতার। মনে রাখা প্রয়োজন, আইন তৈরির মূল উদ্দেশ্য মানুষকে শুধুই শাস্তি দেওয়া নয়; বরং কোনটি অপরাধ, তা জানিয়ে এর থেকে দূরে রাখা। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশের বেশির ভাগ প্রচলিত আইন সম্পর্কে সাধারণ মানুষ কিছুই জানে না।’ আমরা মনে করি, ইন্টারনেটনির্ভর এই যুগে নাগরিকদের ডিজিটাল জীবনের নিরাপত্তা দেওয়ার পাশাপাশি মত প্রকাশের মৌলিক অধিকার রক্ষা করাই আইনের আসল লক্ষ্য হওয়া উচিত। একই সঙ্গে সবার জন্য ডিজিটাল সাক্ষরতা এখন সময়ের দাবি। সর্বোপরি আইনের অপপ্রয়োগ রোধ করে এর সুফল নিশ্চিত করতে হবে।
