বর্ষায় ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক-মহাসড়কের স্থায়ী উন্নয়ণ দরকার

একসময় যা ছিল অভাবনীয়, এখন সেটিই বাস্তবÑপ্রত্যন্ত গ্রামেও পাকা সড়ক। দেশের কোনায় কোনায় পিচঢালা পথ। কিন্তু হতাশার কথা হলো, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে হাজার হাজার কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়কে ভাঙনের মূল কারণ বর্ষা নয়, বরং অব্যবস্থাপনা। চলতি বছর এরই মধ্যে সাড়ে ছয় হাজার কিলোমিটার সড়ক ও মহাসড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া জেলা-উপজেলা পর্যায়ে অনেক সড়কের ক্ষয়ক্ষতির চিত্র এখনো সামনে আসেনি। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে টানা ভারি বর্ষণে দেশের প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কিলোমিটার সড়ক-মহাসড়কের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। গত বছরও বন্যায় একই পরিমাণ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এবার ধারণা করা হচ্ছে, বন্যার পানি নেমে গেলে এবং মাঠ পর্যায়ের সব তথ্য এলে ক্ষতির পরিমাণ সাত হাজার কিলোমিটার ছাড়াতে পারে। জানা গেছে, শুধু চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাঁচ জেলায় ২১২.৯৪ কিলোমিটার মহাসড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সড়কে কোথাও কোথাও বড় গর্ত হয়ে আছে। নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দা উপজেলায় প্রায় ১২ কিলোমিটার সড়ক একেবারে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। রাজশাহী জেলার ৯ উপজেলায় অন্তত ২০০ কিলোমিটার সড়ক খানাখন্দে রূপ নিয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের চিত্র পত্রপত্রিকায় আসছে। আর্থিক দিক বিবেচনায় এসব ক্ষতির পরিমাণ হাজার কোটি টাকারও বেশি। খবরে বলা হয়েছে, এলজিইডির প্রায় পাঁচ হাজার কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয়েছে প্রায় এক হাজার ৫৩৭ কোটি টাকা। খবরে বলা হয়েছে, এরই মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সড়কে কাজ শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সামছুল হক মনে করেন, বন্যা, জলাবদ্ধতা ও অতিবৃষ্টিকে সড়কের ক্ষয়ক্ষতির প্রধান কারণ হিসেবে দেখানো হলেও প্রকৃত সমস্যা অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি, পরিকল্পনা ও দূরদর্শী উন্নয়নে ব্যর্থতা। নগর ও মহাসড়কে নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার করা হয় না, পানি চলাচলের পথ দখল হয়ে যায়। ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নামতে পারে না এবং দীর্ঘ সময় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। আর এই দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতাই সড়কের সবচেয়ে বড় শত্রু। বাংলাদেশে যেটিকে সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ বলা হয়, বাস্তবে সেটি রক্ষণাবেক্ষণ নয়; বরং ভেঙে যাওয়ার পর পুনর্বাসন। প্রকৃত রক্ষণাবেক্ষণ হলো সমস্যা সৃষ্টি হওয়ার আগেই ছোট ছোট প্রতিরোধমূলক কাজ করা। খবরে বলা হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের কারণে বহু মানুষ সীমাহীন ভোগান্তিতে পড়েছে। অনেক এলাকায় যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। যাত্রীর পাশাপাশি মালপত্র পরিবহনেও প্রতিবন্ধকতা দেখা দিয়েছে। এতে ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। অভিযোগ রয়েছে, মেরামতের নামে মানহীন সামগ্রী দিয়ে সড়কে দায়সারা উপায়ে জোড়াতালি দেওয়া হয়। এতে মেরামত টেকসই হয় না। দ্রুতই আবার খানাখন্দে পরিণত হয়। এসব অনিয়ম রোধে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। আমরা মনে করি, সড়ক-মহাসড়কের টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো জনভোগান্তির বিষয়টি আমলে নিয়ে দ্রুত সড়ক উন্নয়নে যথাযথ ব্যবস্থা নেবেÑএটিই কাম্য।
