জাতীয় সংবাদ

র‌্যাব বিলুপ্তির দাবি ছিল, একই ধরনের বাহিনী কেন? প্রশ্ন শফিকুর রহমানের

প্রবাহ রিপোর্ট : র‌্যাবের কার্যক্রম নিয়ে অতীতের অভিজ্ঞতা সুখকর নয় মন্তব্য করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, র‌্যাব বিলুপ্তির দাবি ছিল। কিন্তু এখন একই ধরনের আরেকটি বাহিনী গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শুধু নাম পরিবর্তন করে আগের কাঠামো বহাল রাখলে জনগণ তা স্বাভাবিকভাবে নেবে না।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিলের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি প্রস্তাবিত আইনটি চলতি অধিবেশনে পাস না করে আরও পর্যালোচনা ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করার আহ্বান জানান।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এই বিলটি জাতীয় জীবনের অন্য সাধারণ বিলগুলোর মতো নয়। র‌্যাব প্রতিষ্ঠার পর এ জাতির সামগ্রিক অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। এর কিছু ইতিবাচক দিক থাকলেও নেতিবাচক দিক এত বেশি ছিল যে তা গোটা বিশ্বকে উদ্বিগ্ন করেছে।
তিনি বলেন, এই সংসদে র‌্যাবের হাতে ভুক্তভোগী অনেকেই আছেন। তিনিও নিজে র‌্যাবের হাতে ভুক্তভোগী হয়েছেন। তবে তিনি বেঁচে আছেন। অনেক মানুষ নির্মমভাবে জীবন দিয়েছেন, আবার কেউ গুমের শিকার হয়ে কোথায় আছেন, তারও কোনো সন্ধান নেই।
র‌্যাবের হাতে নিহত চিকিৎসক ফয়েজ আহমদের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, তার স্ত্রী মারজিয়া বেগম আজ সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের একজন সংসদ সদস্য। ফয়েজ আহমদ মানবিক চিকিৎসক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাকে রাত ১২টার দিকে শয়নকক্ষ থেকে তুলে ছাদে নিয়ে অমানবিক নির্যাতন করা হয়। পরে জীবিত অবস্থায় তাকে ছাদ থেকে নিচে ফেলে দেওয়া হয়। পরিবারের সদস্যরা চোখের সামনে এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, এই বাহিনী বিলুপ্ত করার দাবি ছিল সবার। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও বিভিন্ন সময়ে এ বিষয়ে কথা বলেছেন। দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলোও র‌্যাব বিলুপ্তির দাবি জানিয়েছে। কিন্তু র‌্যাব বিলুপ্ত করে একই ধরনের আরেকটি বাহিনী গঠনের দাবি কারও ছিল না।
তিনি বলেন, এখন দেখা যাচ্ছে, সরকারি পক্ষ থেকে একই ধরনের আরেকটি বাহিনী গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, আগের বাহিনীর কাঠামো ও ব্যবস্থাপনাও অনেকটা একই জায়গায় রেখে প্রস্তাব আনা হয়েছে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, মাত্র পাঁচ দিন আগে এই বিল নিয়ে যখন আলোচনা চলছে, তখন একই বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে বিস্ময়কর একটি ঘটনা ঘটেছে। পুরান ঢাকায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এক ছাত্রীকে তার বাসা থেকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। সেখানে কোনো সার্চ ওয়ারেন্ট ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের লোকজন দ্রুত সেখানে না গেলে ওই মেয়েটিকে নিয়ে কী ঘটত, তা বলা কঠিন। মেয়েটি কোনো সামাজিক অপরাধ করেছেন কিনা, সেটি তারা জানেন না। কিন্তু ঘটনাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে।
তার ভাষ্য, যে বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সদস্যদের আচরণে পরিবর্তন আসেনি, তারা আগের মতোই রয়েছেন। শুধু বাহিনীর নাম পরিবর্তন করে সদস্য, স্থাপনা, লজিস্টিক ও জনবল একই রেখে দিলে প্রকৃত পরিবর্তন হবে না। ‘শুধু নাম বদলালে আরেকটা নাম আসে এর বেশি কিছু না। এটা তো এই জাতি চায় না,’ যোগ করেন তিনি।
প্রস্তাবিত বিলটি বিস্তারিত পড়েছেন উল্লেখ করে সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা জানান, স্থায়ী কমিটিতে দেওয়া নোট অব ডিসেন্টও তিনি দেখেছেন। তবে বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়ে বিলটি উত্থাপনকারী সদস্যের প্রতি তিনি অনুরোধ জানান, বিষয়টি আরও গভীরভাবে পর্যালোচনা করার।
র‌্যাব গঠনের সময় বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, তখন লুৎফুজ্জামান বাবর স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। তার সময়ে র‌্যাবের হাতে জাতীয়তাবাদী দলের লোকজনও সবচেয়ে বেশি নিগৃহীত হয়েছেন বলে তিনি মনে করেন। পরে অন্যরাও ভুক্তভোগী হয়েছেন। অর্থাৎ জাতির কোনো অংশই এর বাইরে থাকেনি।
ডা. শফিকুর রহমান আরো বলেন, প্রস্তাবিত আইন সামনে আসার পর দেশের সুশীল সমাজ থেকেও আপত্তি উঠেছে। সবাই উদ্বিগ্ন। তাই চলতি অধিবেশনেই বিলটি পাস করার প্রয়োজন নেই। বিষয়টি নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে আরও আলোচনা ও গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করা দরকার। কেন এমন একটি বিশেষায়িত বাহিনীর প্রয়োজন, তার যথার্থতা আরও পরিষ্কার হতে হবে। জনগণকে বোঝাতে হবে যে দেশের জন্য এ ধরনের একটি বিশেষায়িত বাহিনী প্রয়োজন। জনগণকে এ বিষয়ে আশ্বস্ত করা না গেলে এবং তারা বিষয়টি গ্রহণ না করলে এটি স্বাভাবিকভাবে নেওয়া হবে না।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও র‌্যাব নিয়ে আপত্তি ও বিভিন্ন দাবি জানিয়েছিল। নতুন করে একই ধরনের বাহিনী গঠন করলে সেই আপত্তির সমাধান হবে না। বরং দেশের জন্য নতুন করে একটি বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এ সময় তিনি প্রস্তাবিত বিলে কিছু পরিবর্তন ও নতুন বাধ্যবাধকতা যুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু মৌলিক জায়গাগুলোতে তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি বলেও মন্তব্য করেন।
‘আমার অপরাধ, আমি তদন্ত করব, এই হচ্ছে আমাদের অবস্থা এই আইনের,’ যুক্ত করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, কোনো অবস্থাতেই এই আইন পাস করা উচিত নয়। জাতির বৃহত্তর স্বার্থে বিলটি প্রত্যাহার করা দরকার। সরকারি দল জনগণের মতামত ও বাস্তব অভিব্যক্তির প্রতি সম্মান দেখিয়ে বিলটি প্রত্যাহার করবে এবং পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় চিন্তাভাবনা ও পর্যালোচনা করে নতুনভাবে উদ্যোগ নেবে এটাই প্রত্যাশা।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button