স্থানীয় সংবাদ

মিষ্টির মিষ্টতাতেই বিষ! খুলনায় মিলছে জীবাণু ও ক্ষতিকর রাসায়নিক

# মিষ্টিতে কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি, রয়েছে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি
# সংগৃহীত ১ হাজার ৫১১টি নমুনার ৪৬৩টিতে ভেজাল শনাক্ত
# আইনের দূর্বলতায় বেপরোয়া থেকে যাচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ীরা।

কামাল মোস্তফা : শিশু থেকে বৃদ্ধÑসব বয়সী মানুষের পছন্দের মিষ্টি জাতীয় খাবারেও মিলছে ক্ষতিকর উপাদান ও জীবাণু। পরীক্ষায় মিষ্টিতে কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি যেমন পাওয়া গেছে, তেমনি রসালো জিলাপিকে মুচমুচে ও আকর্ষণীয় রাখতে ব্যবহার করা হচ্ছে কাপড়ে ব্যবহৃত ক্ষতিকর রং ও রাসায়নিক। শুধু মিষ্টি নয়, হোটেলের সালাদ, মাছ-মাংসের তরকারি ও ভর্তাতেও পাওয়া গেছে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর জীবাণু। জেলা নিরাপদ খাদ্য অফিসের সংগৃহীত বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের নমুনা পরীক্ষায় উঠে এসেছে এমন উদ্বেগজনক তথ্য। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খাদ্যে ভেজাল ও দূষণ রোধে নিয়মিত অভিযান এবং সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হলেও অসাধু ব্যবসায়ীদের একটি অংশ নিয়ম ভেঙে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে সতর্কতা ও জরিমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে ব্যবস্থা। ফলে অসাধু ব্যবসায়ীরা বেপরোয়াই থেকে যাচ্ছে। জেলা নিরাপদ খাদ্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত এক বছরে খুলনার বিভিন্ন বাজার ও প্রতিষ্ঠান থেকে ১ হাজার ৫১১টি খাদ্যপণ্যের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৬৩টি নমুনায় ভেজাল বা অনিরাপদ উপাদান শনাক্ত হয়েছে। পরীক্ষায় শুধু মিষ্টি জাতীয় খাবারেই নয়, বিভিন্ন হোটেল ও রেস্তোরাঁর খাবারেও পাওয়া গেছে জীবাণুর উপস্থিতি। সালাদ, মাছ ও মাংসের তরকারি এবং বিভিন্ন ধরনের ভর্তায় মানবমলের সঙ্গে সম্পর্কিত জীবাণু বা কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া শনাক্ত হয়েছে। একই সঙ্গে পাস্তা, দুধ, সস, সরিষার তেল, চিপস, ডালডা, গুড়, ঘি, মধুসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যে অতিমাত্রায় ভেজালের তথ্য পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক ও জীবাণুর উপস্থিতি তাৎক্ষণিকভাবে খাদ্য বিষক্রিয়া, ডায়রিয়া, বমি, পেটের অসুস্থতাসহ নানা সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। দীর্ঘদিন এসব খাবার গ্রহণ করলে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। খাদ্যদূষণ ও ভেজালের প্রবণতা অব্যাহত থাকলে দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সার, কিডনি ও লিভারের রোগ, হৃদরোগ, থাইরয়েডের জটিলতা, শিশুদের বিকাশজনিত সমস্যা এবং পানিবাহিত রোগের প্রকোপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। জেলা নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা মো. মোখলেসুর রহমান বলেন, “খুলনার বিভিন্ন বাজার থেকে সংগৃহীত নমুনা সক্ষমতা অনুযায়ী আমাদের ল্যাবে পরীক্ষা করি। আবার অনেক পণ্য আছে, যেগুলো পরীক্ষা করার সক্ষমতা আমাদের নেই। সেগুলো ঢাকায় পাঠাতে হয়।
তিনি আরও বলেন, “মানুষকে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের সততার সঙ্গে ব্যবসা করতে হবে।” সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কোনো প্রতিষ্ঠানের পণ্যে ভেজাল শনাক্ত হলে অনেক ক্ষেত্রে প্রথমে সতর্ক করা হয় এবং পরে ফলোআপে রাখা হয়। ফলে বড় ধরনের শাস্তির মুখোমুখি হতে হয় খুব কম ব্যবসায়ীকে। ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা কনসাস কনজুমার সোসাইটি খুলনার সমন্বয়কারী বলেন, খুলনা জেলায় প্রায় ২৬ লক্ষ মানুষের বসবাস। অথচ এই বিপুল সংখ্যক ভোক্তার নিরাপদ খাদ্য দেখভাল করার দায়িত্বে নিয়োজিত মাত্র ৫ জন। অসাধু ব্যবসায়ীরা প্রতিনিয়ত মানুষকে জীবন ধ্বংসকারী ভেজাল খাদ্য খাওয়াচ্ছে, অথচ দূর্বল আইনের কারণে তারা শাস্তির মুখোমুখি হচ্ছে না। কখনো কখনো নাম মাত্র জরিমানা দিয়ে পুনরায় একই কাজে লিপ্ত। নিরাপদ খাদ্য ও ভোক্তা অধিকার এই দুই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বাড়াতে হবে। লোক দেখানো অভিযান করলে চলবে না। মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাঃ ফরহাদুল ইসলাম তুহিন বলেন, মিষ্টি জাতীয় খাবারে যে ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে তাতে সোডিয়াম সালফাইড থাকে। এগুলো মূলত টেক্সটাইলে ব্যবহার করা হয়। জিলাপি বা মিষ্টি চকচকে করতে এটা মেশানো হচ্ছে, যা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। খাবারের সাথে এই ক্ষতিকর রাসায়নিক মানুষের শরীরে প্রবেশ করলে মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব হতে পারে। আবার কারো যদি এলার্জির সমস্যা থাকে তার ক্ষেত্রে শ্বাস কষ্ট হতে পারে। কখনো কখনো তা মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। সাধারণ ভোক্তাদের পরামর্শ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, মিষ্টি জাতীয় খাবার ক্রয় বা খাওয়ার ক্ষেত্রে যদি মনে হয় অস্বাভাবিক চকচকা তবে সেটা এড়িয়ে যাওয়াই ভালো। এ ছাড়া খাবার গ্রহণে সচেতন হওয়া জরুরি।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button