জাতীয় সংবাদ

ভাল্বের পরীক্ষা সফল : উৎপাদনে আসছে রূপপুরের প্রথম ইউনিট

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলায় নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের কমিশনিং কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। সেফটি ভাল্ব হিসেবে ব্যবহৃত প্রেসার অপারেটেড রিলিফ ভালভ (চঙজঠ/চঙঝঠ)-এর সমস্যা সমাধানের পর বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) ১৬ মেগাপাসকেল (গচধ) উচ্চচাপে এর পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) রাতে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (ঘচঈইখ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জায়েদুল হাসান চঙজঠ-এর সমস্যা সমাধান ও পরীক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, আগের রাত থেকে শুরু হওয়া পরীক্ষাটি মেইন কন্ট্রোল রুম (গঈজ) ও ইমার্জেন্সি কন্ট্রোল রুম (ঊঈজ)-উভয় স্থান থেকেই পরিচালনা করা হয়। পরীক্ষার সময় কন্ট্রোল ভাল্বগুলোর কার্যকারিতা যাচাই করা হয়। এগুলোর কার্যক্রম সন্তোষজনক পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট মেইন সেফটি ভালভের (গঝঠ) কার্যক্রম ও প্রতিক্রিয়াও পরীক্ষা করা হয়। এ সময় ভাল্বের প্রতিক্রিয়া, খোলা ও বন্ধ হওয়ার কার্যক্রম, অ্যালার্ম এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রক্রিয়াগত পরামিতি পর্যবেক্ষণ করা হয়। ড. জায়েদুল হাসান বলেন, অনুমোদিত পদ্ধতি ও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা শর্ত কঠোরভাবে অনুসরণ করেই পরীক্ষা পরিচালনা করা হয়েছে। পরীক্ষা শুরুর আগে ও চলাকালে যোগাযোগব্যবস্থা, অগ্নিনিরাপত্তা ও বিকিরণ নিরাপত্তাসহ সংশ্লিষ্ট সব নিরাপত্তাব্যবস্থা যাচাই করা হয়। তিনি বলেন, চঙজঠ পরীক্ষার সফল সমাপ্তি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কমিশনিং প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। কারণ, রিঅ্যাক্টরের প্রাইমারি সিস্টেমে নিরাপদ চাপ বজায় রাখার সঙ্গে এই ব্যবস্থা সরাসরি সম্পৃক্ত। কমিশনিং কার্যক্রমে নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিটি পরীক্ষা প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি, অনুমোদন, ব্রিফিং ও নিরাপত্তা শর্ত নিশ্চিত হওয়ার পরই পরিচালনা করা হচ্ছে। নির্ধারিত সময়সূচি বজায় রাখতে গিয়ে নিরাপত্তার সঙ্গে কোনো আপস করা হবে না। পরবর্তী ধাপে প্রায় ১৮ গচধ চাপে আরও একটি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। কমিশনিং দল ধাপে ধাপে এগিয়ে প্রতিটি পর্যায় সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করে পরবর্তী ধাপে যাওয়ার প্রক্রিয়া অনুসরণ করছে। এর আগে সেফটি ভাল্বের ত্রুটির কারণে রূপপুরের প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর সময়সূচি অনিশ্চয়তায় পড়ে। রিঅ্যাক্টরের প্রেসারাইজারে থাকা চঙজঠ-তে বারবার ত্রুটি দেখা দেওয়ায় এ জটিলতা তৈরি হয়। প্রাইমারি কুলিং সিস্টেমে অতিরিক্ত চাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করা এই ভাল্ব রিঅ্যাক্টরের গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা উপাদান। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এসময় জানিয়েছিলেন, ইউনিট-১ চালুর লক্ষ্যে রাশিয়ার পরমাণু প্রকৌশল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জেএসসি এএসই ইউনিট-২ থেকে একটি পাইলট-অপারেটেড রিলিফ ভালভ (চঙজঠ) ইউনিট-১-এ স্থানান্তরের প্রস্তাব দিয়েছিল। গত ৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর আগারগাঁওয়ের আইসিটি টাওয়ারে এক সংবাদ সম্মেলনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানিয়েছিলেন, সেফটি ভাল্বের ত্রুটির কারণে প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর সময় পিছিয়ে যাচ্ছে। তবে ত্রুটি মেরামত বা বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর নির্দিষ্ট সময়সীমা তখন জানানো হয়নি। পরে সমস্যা সমাধানে রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনার পর গত ২২ সেপ্টেম্বর পাঁচ সদস্যের একটি রুশ বিশেষজ্ঞ দল রূপপুরে আসে। বাংলাদেশি ও রুশ বিশেষজ্ঞদের যৌথ প্রচেষ্টায় চঙজঠ-এর সমস্যা সমাধান এবং পরবর্তী পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে বলে জানান ঘচঈইখ-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক। এদিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটের পারমাণবিক জ্বালানি তথা ইউরেনিয়ামের প্রথম চালান শুক্রবার (২ অক্টোবর) ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। শনিবার (৩ অক্টোবর) ঈশ্বরদীর রূপপুর এসে পৌঁছাবে। মোট সাতটি চার্টার্ড ফ্লাইটে অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি বাংলাদেশে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। রূপপুর প্রকল্পের নির্মাণকারী রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, দ্বিতীয় ইউনিটের পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহ ২০২৬ সালের অক্টোবর মাসে শুরু হয়ে ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হবে। চুক্তি ও প্রকল্পের সময়সূচি অনুযায়ী একাধিক ফ্লাইটে এসব জ্বালানি পরিবহন করা হবে। ঘচঈইখ-এর এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, সাধারণত জ্বালানিবাহী ফ্লাইট বাংলাদেশে পৌঁছানোর পর বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থায় তা প্রকল্প এলাকায় নেওয়া হয়। সে অনুযায়ী প্রথম চালান বৃহস্পতিবার পৌঁছালে শুক্রবার (২ অক্টোবর) বিশেষ নিরাপত্তায় সড়কপথে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ঈশ্বরদীর রূপপুর প্রকল্প এলাকায় নেওয়া হতে পারে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের মূল প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা। সংশোধিত প্রাক্কলনে তা বেড়ে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার ৭০০ কোটি টাকা হয়েছে। রাশিয়ার সঙ্গে সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) ব্যবস্থায় নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় কম-কার্বন বিদ্যুতের একটি বড় উৎস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। চঙজঠ-এর সমস্যা সমাধান ও সফল পরীক্ষা কমিশনিং কার্যক্রমকে পরবর্তী ধাপে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button