সম্পাদকীয়

মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি অবহেলা কাম্য নয়

আমাদের শরীর খারাপ হলে যত দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হই, কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি হলে তেমন গুরুত্ব দিই না। মোটাদাগে আমাদের দেশের চিত্র এমনই। তথ্যও তাই বলছে। দেশে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতি ছয়জনে একজন কোনো না কোনো মানসিক রোগে ভুগছেন। আর তাঁদের মধ্যে ৯১.৯ শতাংশই চিকিৎসাসেবার বাইরে। এমন প্রেক্ষাপটে গতকাল পালিত হয়েছে বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। গবেষণার বরাত দিয়ে বলা হয়, ক্যান্সার রোগীদের মধ্যে মানসিক রোগ সবচেয়ে বেশি লক্ষ করা গেছে। রোগ নিয়ে শঙ্কা, চিকিৎসার অনিশ্চয়তা এবং আর্থিক চাপের কারণে রোগীরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। প্রায় ৮৮ শতাংশ ক্যান্সার রোগী মানসিক রোগে ভুগছেন। হতাশার দিক হলো, তাঁদের মধ্যে মাত্র ৭ শতাংশ রোগীকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে পাঠানো হয়। বাকিদের অনেক সময় ঘুমের ওষুধ দিয়ে দায়িত্ব শেষ করা হয়। অথচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, মানসিক রোগের ক্ষেত্রে ঘুমের ওষুধ মূল চিকিৎসা নয়। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বজুড়েই মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী দ্য ল্যানসেটে প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিশ্বে প্রায় ১২০ কোটি মানুষ বিভিন্ন মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত ছিল। ১৯৯০ সালের তুলনায় এই সংখ্যা বেড়েছে ৯৫.৫ শতাংশ। গবেষণায় ২০৪টি দেশ ও অঞ্চলে বয়স, লিঙ্গ, ভৌগোলিক অবস্থান ও আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় ১২ ধরনের মানসিক সমস্যার প্রবণতা বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা গেছে, উদ্বেগ ও বিষণœতা ছিল সবচেয়ে সাধারণ মানসিক সমস্যাগুলোর মধ্যে। দেশের মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ সীমিত। এর আগে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এই সেবার পরিধি বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছিল। জেলা পর্যায়ে অন্তত পাঁচ শয্যার মানসিক স্বাস্থ্য ইউনিট চালু এবং প্রতিটি হাসপাতালে অন্তত একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ পদায়নের কথা বলা হয়েছিল, কিন্তু সেসবের কোনো কিছুই বাস্তবায়িত হয়নি। সময় বদলেছে। মানুষের জীবনযাপনের ধরনে পরিবর্তন এসেছে। কর্মক্ষেত্র থেকে শুরু করে পারিবারিক পর্যায়েও মানসিক চাপে থাকে বেশির ভাগ মানুষ। কাজেই এই সময়ে মানসিক স্বাস্থ্যে অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যথার্থই বলেছেন, ‘দৃশ্যত স্বাস্থ্যবান অথবা নীরোগ থাকাটাই স্বাস্থ্য নয়, বরং শারীরিক, মানসিক, আত্মিক ও সামাজিকভাবে ভালো থাকার নামই স্বাস্থ্য। সুতরাং কোনোভাবেই মানসিক স্বাস্থ্যকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।’ প্রাত্যহিক ব্যস্ত জীবনের এই বাস্তবতায় এবার বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিবাদ্য ‘জীবনের কথা শুনি, বাস্তব পরিবর্তন আনি’ বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। প্রকৃত অর্থেই আমাদের জীবনের কথা শুনতে হবে এবং সে অনুযায়ী পরিবর্তন আনতে হবে। দেশের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো সময়োপযোগী করা অপরিহার্য। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করতে হবে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button