সম্পাদকীয়

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হোক

বাংলাদেশের জনজীবনে নতুন আতঙ্কের নাম মব সন্ত্রাস। দেশে মব সন্ত্রাস বা গণপিটুনির ঘটনা ভয়াবহভাবে বেড়েছে। যখন কোনো জনপদে আইন তার নিজস্ব গতি হারায় এবং বিচারব্যবস্থা কেবল শক্তিশালী ও প্রভাবশালীদের বর্ম হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে, তখন সেখানে জন্ম নেয় এক ভয়াবহ দানব—যার নাম ‘মব জাস্টিস’ বা গণবিচার। বিদায়ী বছরে গণপিটুনি বা মব সন্ত্রাসে ১৯৭ জনের মৃত্যু হয়েছে, ২০২৪ সালে এই সংখ্যাটা ছিল ১২৮। গত বছর কারা হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যাও আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে। গত বছর এবং পূর্ববর্তী বছর এই সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ১০৭ ও ৬৫। বিচারবহির্ভূত খুনও কমেনি। ২০২৫ সালে ৩৮ জন এই রাষ্ট্রীয় সহিংসতার শিকার হয়েছেন, ২০২৪ সালে সংখ্যাটা ছিল ২১। অথচ কথা ছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এমন গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা শূন্যে নেমে আসবে। মব সহিংসতার সাম্প্রতিক উদাহরণ হিসাবে ভালুকার দিপু চন্দ্র দাসের হত্যাকা- ছিল ভয়ানক। তাকে যেভাবে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে, তা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে। এমন মানবতার অবমাননার অঘটন ঘটেছে লক্ষ্মীপুরে, শিশুসহ পরিবারকে আটকিয়ে গৃহে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। সংবাদমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের অফিসে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও খুব একটা পুরাতন নয়। কিন্তু হতাশার বিষয় হলো, এইভাবে সমগ্র দেশে মব সহিংসতা হলেও সরকার কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি। যথাসময়ে যথা-উদ্যোগের অভাবে কতিপয় গোষ্ঠী আশকারা পেয়েছে এবং বারবার তার পুনরাবৃত্তি হয়েছে। সরকারের তরফ হতে মব সন্ত্রাসে শূন্য সহিষ্ণুতা দেখাবার কথা বলা হলেও এর সঙ্গে জড়িতদের বিচারের নজির না থাকার কারণে অপরাধের পুনরাবৃত্তি হয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার-সংক্রান্ত বৈশ্বিক ঘোষণা অনুযায়ী, মব সন্ত্রাসের কারণে মানবাধিকারের বড় লঙ্ঘন হয়। ঘোষণার ১০ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ট্রাইব্যুনালের অধীনে সবার সমতার ভিত্তিতে ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। আর ঘোষণার ১১ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত অভিযুক্ত ব্যক্তির অধিকার—তাকে যেন নিরপরাধ বলে বিবেচনা করা হয়। একই সঙ্গে বিচারের সময় অভিযুক্ত ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থাকতে হবে। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।’ গত বছরের ৫ থেকে ২০ আগস্ট পর্যন্ত দেশের ৪৯ জেলায় হামলায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অন্তত ১ হাজার ৬৮টি ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোনো সভ্য সমাজে এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি চলতে পারে না। আইনের শাসন ব্যতীত গণতন্ত্রও কার্যকর হয় না। আমাদের প্রত্যাশা, মব সহিংসতার প্রতিটা ঘটনায় স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য তদন্তের ব্যবস্থা হবে; সেই তদন্তের ভিত্তিতে অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button