নিপাহ ভাইরাসে মৃত্যুঝুঁকি, সতর্কতা জরুরি

সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে নিপাহ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব। নিপাহ ভাইরাস একটি ভাইরাসজনিত জুনোটিক রোগ, অর্থাৎ এটি প্রাণীর দেহ থেকে মানুষের শরীরে সংক্রমিত হয়। যদিও বিভিন্ন প্রাণীর মাধ্যমে এ রোগ ছড়াতে পারে, তবে ফলখেকো বাদুড়কে এর প্রধান বাহক হিসেবে ধরা হয়। আক্রান্ত প্রাণী বা বাদুড়ের মাধ্যমে সংক্রমণের পাশাপাশি আক্রান্ত মানুষ থেকে মানুষেও এই ভাইরাস ছড়াতে সক্ষম। নিপাহ ভাইরাসে মানুষ আক্রান্ত হলে রোগটি মানব দেহে মারাত্মক রূপ নিতে পারে এবং এ রোগে মৃত্যুর হার অত্যন্ত বেশি, প্রায় ৪০ থেকে ৭৫ শতাংশ। মেরু অঞ্চল ও মরুভূমি বাদে বিশ্বের প্রায় সব এলাকায় বাদুড়ের বিস্তৃতি রয়েছে। বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় ১৪০০ প্রজাতির বাদুড় শনাক্ত করা হয়েছে, যা এই ভাইরাসের বিস্তারের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। শীতের আগমন মানেই যেন খেজুরের কাঁচা রস খাওয়ার এক ধরনের বিলাসী প্রতিযোগিতা শুরু হয়। আমরা জানি, খেজুরের কাঁচা রসের সঙ্গে নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু এই বিলাসী প্রতিযোগিতাই অনেক সময় আমাদের জন্য মরণব্যাধিতে পরিণত হয়। চলতি বছর (২০২৬) ইতোমধ্যে দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৩৫টিতে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ফরিদপুর, রাজবাড়ী, নওগাঁ ও লালমনিরহাট জেলায় সবচেয়ে বেশি রোগী পাওয়া গেছে। এর আগে ২০০৫ সালে সর্বোচ্চ ৯২ শতাংশ মৃত্যুর রেকর্ড থাকলেও বর্তমানে মৃত্যুর হার সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। আইইডিসিআরের তথ্যমতে, ২০০১ থেকে এ পর্যন্ত দেশে ৩৪৭ জন এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে, যার মধ্যে ২৪৯ জনই প্রাণ হারিয়েছে। গড় মৃত্যুহার ৭২ শতাংশ হলেও ২০২৪ ও ২০২৫ সালে আক্রান্ত ৯ জনের সবাই মারা গেছে। এই চিত্র প্রমাণ করে যে নিপাহ ভাইরাস আরো প্রাণসংহারী হয়ে উঠছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, আগে নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় এই ভাইরাসের প্রকোপ সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন ভোলাসহ দেশের ৩৫টি জেলায় এটি ছড়িয়ে পড়েছে। অর্থাৎ দেশের অর্ধেকেরও বেশি জেলা এখন নিপাহর ঝুঁকিতে। বিষয়টি জাতীয় স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। সে অর্থে প্রতিরোধই একমাত্র সুরক্ষা। প্রয়োজনে আইনগত বাধ্যবাধকতার মাধ্যমে নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধির অভিযান জোরদার করতে হবে। নিপাহ ভাইরাসের লক্ষণ দেখা দিলে কালবিলম্ব না করে দ্রুত নিকটস্থ সরকারি হাসপাতালে রোগীকে নিয়ে যেতে হবে এবং তাকে মানসিকভাবে সাহস জোগাতে হবে। সতর্কতা ও সচেতনতার বিকল্প নেই। তবেই এই মরণব্যাধি নিপাহ ভাইরাস থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।
