সম্পাদকীয়

গুমের রাজনীতি ও রাষ্ট্রের দায়

গুম-শুধু একটি অপরাধ নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের নৈতিক ও সাংবিধানিক ব্যর্থতার সবচেয়ে ভয়াবহ প্রকাশ। সদ্য প্রকাশিত গুম-সংক্রান্ত ইনকোয়েরি কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায়কে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নথিবদ্ধ করেছে। প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, শেখ হাসিনার শাসনামলে চার থেকে ছয় হাজার মানুষ গুমের শিকার হতে পারেন। কমিশনের যাচাইকৃত ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনার মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে-এই অপরাধ ছিল পরিকল্পিত, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতর থেকেই সংঘটিত। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, গুমের শিকারদের বড় অংশই ছিলেন রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ব্যক্তি, বিশেষত বিরোধী দল ও তাদের ছাত্র-যুব সংগঠনের নেতাকর্মী। বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের গুম হওয়া নেতাকর্মীদের এক-তৃতীয়াংশের বেশি আর ফেরেননি, যা তাদের হত্যার শিকার হওয়ার আশঙ্কাকে শক্ত ভিত্তি দেয়। জামায়াত-শিবিরের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যায়, যদিও সংখ্যাগত অনুপাত ভিন্ন। এমনকি ক্ষমতাসীন দলের কিছু নেতাকর্মীও গুমের শিকার হয়েছেন-যারা কেউই ফিরে আসেননি। এই তথ্যই প্রমাণ করে, গুম ছিল রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের একটি কৌশল, যা পরিস্থিতি অনুযায়ী বিস্তৃত বা সংকুচিত হয়েছে। প্রতিবেদন আরও দেখায়, জাতীয় নির্বাচনের আগে বা রাজনৈতিক উত্তাপ বৃদ্ধির সময় গুমের সংখ্যা বেড়েছে। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচন এবং হলি আর্টিসান হামলার পরবর্তী সময়ের পরিসংখ্যান সেই বাস্তবতার সাক্ষ্য দেয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও গ্রেপ্তারের পর আদালতে হাজির না করা, গ্রেপ্তার অস্বীকার এবং পরে ‘নাটকীয়ভাবে’ হাজির করার যে চিত্র উঠে এসেছে, তা আইনের শাসনের সম্পূর্ণ বিপরীত। সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো-এই গুমের সঙ্গে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত। কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘হাই প্রোফাইল’ কিছু গুমের ঘটনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও শীর্ষ নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে র‌্যাব, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা এবং সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের যৌথ বা সমন্বিত ভূমিকার কথাও উঠে এসেছে, যা দায় নির্ধারণকে আরও জটিল কিন্তু জরুরি করে তুলেছে। এই প্রতিবেদন কেবল অতীতের হিসাব নয়; এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি পরীক্ষা। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা ছাড়া রাষ্ট্র এই অধ্যায় থেকে বের হতে পারবে না। মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠন, গোপন বন্দিশালা ও হত্যাস্থলগুলোর ম্যাপিং এবং স্বচ্ছ বিচারিক প্রক্রিয়া-এসব উদ্যোগ এখন আর রাজনৈতিক অঙ্গীকার নয়, বরং রাষ্ট্রীয় কর্তব্য। গুমের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসাই হবে বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রথম শর্ত।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন
Close
Back to top button