বিদ্যালয়ে নিরাপত্তায় যতœশীল হন

# অল্পের জন্য রক্ষা পেল শিশুটি #
‘ছুটির ঘণ্টা’ আমাদের চলচ্চিত্রে একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত; যা মূলত একটি সত্য ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। ছবিটি ১৯৮০ সালে মুক্তি পায়। ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র একটি ছোট্ট স্কুলছাত্র। দীর্ঘ ছুটির আগের দিন বিদ্যালয়ে ছুটির ঘণ্টা বাজে। কিন্তু সে ভুলবশত স্কুলের বাথরুমে আটকা পড়ে। স্কুলে আর কেউ নেই ভেবে নিরাপত্তা প্রহরীরা দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে চলে যান। শিশুটি ভেতরে আটকে পড়ে বারবার সাহায্যের জন্য চিৎকার করলেও চার দেয়ালের বাইরে আওয়াজ পৌঁছে না। আটকা পড়ে, দীর্ঘ সময় না খেয়ে তার করুণ মৃত্যু হয়। ছবিতে আটকে পড়া শিক্ষার্থীর ভয়, একাকিত্ব এবং বেঁচে থাকার প্রবল আকুতি মর্মস্পর্শীভাবে তুলে ধরা হয়েছে। চলচ্চিত্রটি আমাদের শিক্ষা দেয়, বিদ্যালয়ে নিরাপত্তা ও তদারকি কতটা জরুরি। দায়িত্বহীনতায় কী ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। শিশুদের প্রতি খেয়াল রাখার গুরুত্ব অবহেলা করার নয়। ছবিটি দর্শকদের হৃদয়ে গভীর দাগ কাটে। সমাজকে সচেতন হতে একটি শক্তিশালী বার্তা দেয়। আশির দশকে নির্মিত সেই ছবির বার্তা যে আজো আমরা গুরুত্বসহকারে আমলে নিতে পারিনি তার আবারো প্রমাণ মিলল মেহেরপুরের একটি ঘটনায়। দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিশেষ করে প্রাথমিক স্তরে নিরাপত্তাব্যবস্থা কত ভঙ্গুর ফের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো সীমান্তঘেঁষা জেলা মেহরপুরের ঘটনাটি। দৈনিক প্রবাহ’র খবর অনুযায়ী, ঢাকা শহরের বিএম মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণীর এক শিক্ষার্থী স্কুল ছুটির পর কক্ষে আটকা পড়ার ঘটনা নতুন করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তদারকি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গত বুধবার বেলা ৪টায় বিদ্যালয় ছুটি হলে শিক্ষকরা ভবন ও প্রধান ফটকে তালা মেরে চলে যান। এ সময় দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষে খেলতে গিয়ে আটকা পড়ে আট বছর বয়সী শিক্ষার্থী সাদিয়া। সময় গড়ানোর সাথে সাথে সে ভয়ে চিৎকার ও কান্নাকাটি শুরু করে। তার চিৎকার আশপাশের পথচারীদের কানে পৌঁছালে বিষয়টি গোচরে আসে। স্থানীয়দের সহযোগিতায় বিদ্যালয়ের মূল ফটক খুলে ভেতরে প্রবেশ করেন তার বাবা। তবে ভবনের কলাপসিবল গেট বন্ধ থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। শেষে এক শিক্ষিকাকে ডেকে এনে ঘণ্টাখানেক চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে কাটিয়ে সাদিয়াকে উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকালে শিশুটি আতঙ্কগ্রস্ত ছিল। তবে সুস্থভাবে উদ্ধার হওয়ায় সবাই হাফ ছেড়ে বাঁচেন; যা ছিল স্বস্তিদায়ক। এই ঘটনা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দৈনন্দিন তদারকি ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা সামনে নিয়ে এসেছে। এটি বলে দেয়, ছুটির আগে প্রতিটি শ্রেণীকক্ষ, শৌচাগার ও ভবনের কোনায় কোনায় তল্লাশি নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকদের জবাবদিহি বাড়ানো এবং নিরাপত্তার বিষয়টি কঠোরভাবে অনুসরণ না করলে ভবিষ্যতে আরো বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকেই যায়। এমনিতেই আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা বর্তমানেও খুব দুর্বল। এর মধ্যে আছে অবকাঠামোগত দুর্বলতা, সীমানা প্রাচীর ও প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের অভাব, নিরাপত্তাকর্মী সঙ্কট, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার ঘাটতি, স্বাস্থ্য ও স্যানিটেশন সমস্যা, পরিবহন নিরাপত্তার অভাব, দুর্যোগ প্রস্তুতির ঘাটতি এবং প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার অভাব। এসব এখনো উৎকটভাবে বিদ্যমান। উপরিউল্লিখিত সমস্যাগুলো সমাধানে সরকার, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয়দের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ এবং অবকাঠামো উন্নয়ন করলে শিশুদের জন্য আরো নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব বলে আমরা মনে করি।
