সম্পাদকীয়

আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে আসুন

# বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে উত্তেজনা #

ভারত থেকে অবৈধ পন্থায় লোকজনকে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে পাঠানো বা পুশ ইনের ঘটনায় বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে উত্তেজনা বিরাজ করছে। ভারতের সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনী (বিএসএফ) বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে অব্যাহতভাবে পুশ ইনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) স্থানীয় লোকজনের সহায়তা নিয়ে তা প্রতিরোধ করে যাচ্ছে। গতকাল দৈনিক প্রবাহে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বিএসএফ গত বুধবার সকাল থেকে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সীমান্তের অন্তত ১০টি পয়েন্ট দিয়ে অবৈধভাবে পুশ ইনের চেষ্টা চালায়। বিজিবির কঠোর অবস্থানের কারণে পুশ ইনের সব কটি অপচেষ্টাই ব্যর্থ হয়। ভারত বাংলাদেশের বৃহত্তম প্রতিবেশী। বাংলাদেশ বরাবরই ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষায় আগ্রহী। ভারতে যদি কোনো বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী থেকে থাকে, অবশ্যই বাংলাদেশ তাদের ফেরত নেবে। সে ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক নিয়ম-কানুন রয়েছে, যৌথ সীমান্ত ব্যবস্থাপনার নিয়ম-কানুন রয়েছে; সেগুলো মেনে চলতে হবে। উভয় দেশের বিদ্যমান আইন ও দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার ভিত্তিতে সমস্যার সমাধান করতে হবে। বাংলাদেশকে কিছু না জানিয়ে সীমান্ত দিয়ে কিছু মানুষকে ঠেলে দেওয়া কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ স্পষ্ট জানিয়েছেন, ‘সরকার অবৈধ পুশ ইনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। বর্ডারে আমাদের বিজিবি অ্যালার্ট আছে। যদি ভারতের তরফ থেকে দাবি করা হয় যে কোনো বাংলাদেশি সেখানে অবৈধভাবে আছে, তবে তাদের পরিচয় নিশ্চিত করার পর যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় ফিরিয়ে আনা হবে (রিপ্যাট্রিয়েশন)। কিন্তু জোর করে ঠেলে দেওয়া আমরা মেনে নেব না।’ বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন ও মানবিক রীতিনীতি লঙ্ঘন করে যেভাবে জোরপূর্বক লোকজনকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, তা কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘সীমান্তের এই সংকট দূর করতে দুই দেশের সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে উচ্চ পর্যায়ে আলোচনা করতে হবে। প্রতিবেশী হিসেবে ধৈর্য ও সহনশীলতা প্রদর্শন করা উভয় দেশের জন্যই মঙ্গলজনক।’ মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন মনে করেন, সীমান্তে উত্তেজনা কোনো স্থায়ী সমাধান বয়ে আনবে না। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশকে কোনো উসকানিতে পা দেওয়া যাবে না। তবে বিএসএফ যদি নিয়মিতভাবে এভাবে লোক ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে, তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বিষয়টি উত্থাপন করা প্রয়োজন।’ ভারতের মানবাধিকারকর্মীরাও মনে করেন, পুশ ব্যাক বা পুশ ইন প্রক্রিয়ার কোনো আইনি স্বীকৃতি নেই ভারতে। ভারতের মানবাধিকার সংগঠন ‘মাসুম’-এর প্রধান কিরীটী রায় বলেন, ‘কোনো বিদেশি অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করলে তাকে চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করতে হবে এবং ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করতে হবে। বিদেশি আইনের ১৪ নম্বর ধারা অনুযায়ী মামলা হবে। মামলায় যদি সেই ব্যক্তি দোষী সাব্যস্ত হয়, তাহলে তার সাজা হবে। সাজার শেষে আদালতের মাধ্যমেই যে ব্যক্তি যে দেশ থেকে এসেছে, সেখানে ফেরত পাঠানো হবে। অন্য কোনোভাবে নয়।’ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও মনে করে, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে জোরপূর্বক পুশ ইন মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। সীমান্তের এই পরিস্থিতির মধ্যেই আগামী ৮ থেকে ১১ জুন ভারতের নয়াদিল্লিতে বিজিবি ও বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের ৫৭তম সীমান্ত সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আমরা মনে করি, সেখানে বিষয়টি নিয়ে একটি কার্যকর সমাধানে পৌঁছার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে। এর আগ পর্যন্ত উভয় পক্ষকে আন্তর্জাতিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট আইন-কানুন মেনে ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে। পাশাপাশি কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও অব্যাহত রাখতে হবে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button