মানব পাচারকারীদের দৌরাত্ম্য ঠেকাতে পদক্ষেপ নিন

বেকারত্বের অভিশাপ ঘোচাতে অনেকেই বিদেশে পাড়ি জমাতে উদগ্রীব থাকেন। আর সেই সুযোগটাই নেয় মানব পাচারকারীরা। গ্রামে থাকা চায়ের দোকান থেকে শহরের নানা ফোরামে কিংবা নেট দুনিয়ায় অসংখ্য ফাঁদ পেতে রেখেছে মানব পাচারকারী চক্র। বিদেশে লোভনীয় চাকরি, ভালো বেতন, নানা রকম সুযোগ-সুবিধা তথা উন্নত জীবনের আশ্বাস। জালে একবার আটকে গেলে আর রক্ষা নেই। নেওয়া হবে মোটা অঙ্কের অর্থ। এরপর বিদেশে নিয়ে আটকে রেখে বা জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় করা হবে। গণকবরে ঠাঁই হওয়াসহ আরো অনেক করুণ পরিণতি ঘটবে। গতকাল কালের কণ্ঠে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ভুক্তভোগীদের দুর্বিষহ জীবন ও সীমাহীন নির্যাতনের কথা। নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জের বাসিন্দা ইমরান হোসেন এমনই একজন ভুক্তভোগী। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মানব পাচারকারী চক্র তাঁকে বিমানে করে কুয়েত, তারপর মিসর এবং সব শেষে লিবিয়ায় নিয়ে যায়। যাত্রার শুরুতে মানব পাচারকারী চক্রকে তিনি পাঁচ লাখ টাকা দিয়েছিলেন। লিবিয়ায় তাঁকে জিম্মি করে ড্রিল মেশিন দিয়ে পা ফুটো করার মতো নির্যাতন চালিয়ে আদায় করা হয় আরো ১৯ লাখ টাকা। এরপর প্রায় এক বছর জিম্মিদশায় নির্যাতনের শিকার হয়ে শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সহযোগিতায় গত বছর তিনি দেশে ফিরতে পেরেছেন। ইমরান হোসেনের মতো হাজারো যুবক স্বজনের মুখে হাসি ফোটাতে মানব পাচারকারী চক্রের ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হচ্ছেন। সম্প্রতি ডেনমার্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং জার্মানির ‘রবার্ট বোশ স্টিফটুং’ ফাউন্ডেশনের আর্থিক সহায়তায় ‘মিক্সড মাইগ্রেশন সেন্টার (এমএমসি)’ একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে সমুদ্রপথে ইতালিতে পৌঁছেছেন প্রায় ১৪ হাজার বাংলাদেশি। মানব পাচারকারী চক্রের আদায় করা অর্থের মূল্য বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চক্রের সদস্যরা অন্তত ১৬০ থেকে ১৯০ মিলিয়ন ডলার (প্রায় দুই হাজার ৩০০ কোটি টাকা) সরাসরি পকেটে ভরছে। প্রায় একই পরিমাণ অর্থ বিভিন্ন পর্যায়ে দালাল, ভুয়া নিয়োগপত্র তৈরি এবং ট্রানজিট রুটের খরচ হিসেবে আদায় করে নিচ্ছে। মানবপাচার নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার’-এর বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর মোহাম্মদ তারিকুল ইসলামের মতে, প্রতিবছর গড়ে ২৫ থেকে ৩০ হাজার মানুষ ইতালি যেতে বাংলাদেশ থেকে লিবিয়ায় যায়। তাদের একটি অংশ সমুদ্রপথে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইতালি পৌঁছতে পারে। বাকিদের মধ্যে অনেকের সমুদ্রে মৃত্যু হয়, অনেককে দেশে ফিরে আসতে হয় কিংবা লিবিয়ায় জিম্মিদশায় আটকে থাকতে হয়। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের অনেককে উদ্ধার ও ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়। গত ৭ জুলাই লিবিয়ার বেনগাজির গানফুদা ডিটেনশন সেন্টার এবং ত্রিপোলির তাজুরা ডিটেনশন সেন্টারে বন্দি থাকা ১৭৪ জন বাংলাদেশিকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে বলে জানায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ইউরোপের সীমান্তরক্ষী বাহিনী ফ্রন্টেক্স এবং বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, সেন্ট্রাল মেডিটেরেনিয়ান রুট বা ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে ইতালিতে প্রবেশের চেষ্টাকারী দেশের তালিকায় গত কয়েক বছরের মতো এবারও বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বের মধ্যে প্রথম। মানবপাচার বৈধ অভিবাসনকেও হুমকিতে ফেলে। তাই মানবপাচার রোধে আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। মানবপাচারের বিচার ত্বরান্বিত করতে মানবপাচারপ্রবণ জেলাগুলোতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা অন্য কোনো মাধ্যম ব্যবহার করে কেউ যাতে প্রতারণা করতে না পারে সেদিকে কড়া নজর রাখতে হবে।
