বেপরোয়া সাইবার অপরাধীরা : পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে হবে

অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করা যাচ্ছে, সাধারণ মানুষের জন্য ইন্টারনেট ব্যবহার নিরাপদ ও স্বস্তির হচ্ছে না। অনলাইন দুনিয়ায় সারাক্ষণ ওত পেতে আছে ভয়ংকর সাইবার অপরাধীচক্র। তারা মুহূর্তেই মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য লোপাট করছে, প্রতারণা করে অর্থ নিয়ে যাচ্ছে, সাধারণ মানুষকে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে জিম্মি করছে। সম্প্রতি এসব অপরাধী আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। দেশি-বিদেশি একাধিক চক্রের অন্তত তিন শতাধিক সদস্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ছবি, নাম-পরিচয় ব্যবহার করে সামাজিক মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে দিচ্ছে। এমনকি তারা বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়েও প্রতারণামূলক চিঠি পাঠিয়েছে। পুলিশের বরাত দিয়ে খবরে বলা হয়, সাইবার অপরাধীরা বিভিন্ন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্যসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সিল, সই এবং দপ্তরের লেটারহেড নকল করে নানা জায়গায় উপস্থাপন করছে। সামাজিক মাধ্যমে বিভিন্ন পেজ বা অ্যাকাউন্ট থেকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ফায়দা লুটছে। জানা গেছে, একটি প্রতারক বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি দিয়েছে, যেখানে মালদ্বীপে জনশক্তি রপ্তানির জন্য একটি ভুয়া কম্পানিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। ভাবা যায়, অপরাধীদের হাত কতটা লম্বা হলে তারা মন্ত্রণালয় পর্যন্ত টার্গেট করতে পারে। এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে অনলাইনে জুয়া ব্যাপক মাত্রায় ছড়িয়ে পড়েছে। সাইবার অপরাধীদের একটি বড় অংশ অনলাইন প্রতারণায় সক্রিয়। জানা গেছে, জুয়ার ওয়েবসাইটগুলোর ‘এমএফএস’ অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে প্রতিদিন হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়। এর বেশির ভাগ অর্থ আন্তর্জাতিক চক্রের মাধ্যমে বিদেশে পাচার হয়ে যায়। এরই মধ্যে এই চক্রের সদস্যরা বিপুল অর্থ পাচার করেছে। মানুষের দৈনন্দিন কর্মকা- এখন অনেকটাই অনলাইননির্ভর। অফিসের কাজ থেকে শুরু করে, অনলাইন ব্যাংকিং, কেনাকাটা, বিনোদনসহ অনেক কিছুই মানুষ এখন অনলাইনের ওপর ভরসা করে থাকে। আর এখানেই অপরাধীদের রাজত্ব। ভুয়া কেনাকাটা, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতারণা, বিনিয়োগ প্রতারণা, লটারি বা পুরস্কারের মতো প্রতারণা বেড়েই চলছে। এ ছাড়া কিশোরী বা তরুণীরা সাইবার অপরাধীদের বড় টার্গেট। এদিকে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির বলেন, ‘সাইবার অপরাধ, অনলাইন জুয়া, ফিশিং ও সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব ছড়ানোর মতো অপরাধ এখন বড় সামাজিক সংকট। ফলে অপরাধ মোকাবেলায় দক্ষতার বিকল্প নেই। নতুন প্রযুক্তিতে দক্ষতা বাড়াতে হবে, প্রতিনিয়ত আপডেট হতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল ফরেনসিকের মতো বিষয়ে জ্ঞানার্জন করতে হবে।’ লক্ষণীয় বিষয় হলো, সাইবার অপরাধ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়লেও এখন পর্যন্ত দেশে পৃথক ‘সাইবার পুলিশ ইউনিট’ নেই। এ কারণে অনেক মামলা মাসের পর মাস অমীমাংসিত থেকে যায়। বিচার না পাওয়ায় অনেকে অভিযোগ নিয়ে থানা পুলিশ পর্যন্ত যেতেও চান না। তবে চলতি বছরের ১১ মে সাইবার পুলিশ ইউনিট গঠনের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে সরকার, যা বাস্তবায়ন একান্ত অপরিহার্য। এ কথা ঠিক যে আমাদের দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা পাসওয়ার্ড সংরক্ষণ বা ‘পিন কোড’ শেয়ার না করার মতো প্রাথমিক নিরাপত্তার বিষয়গুলো সম্পর্কেও সচেতন নয়। তাই সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। ডিজিটাল নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গুরুত্ব দিতে হবে। সর্বোপরি মামলার দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
