পাঁচ কারণে মন্দা খুলনার চামড়া বাজার

নির্দ্ধারিত মূল্যের প্রতিফলন ঘটেনি
বাধ্য হয়েই স্বল্প মূল্যে চামড়া বিক্রি
মুহাম্মদ নুরুজ্জামান :
পুঁজি ও সংরক্ষণের স্থান সংকট, নির্ধারিত বাজার না থাকা, ট্যানারির মালিকদের কাছ থেকে বকেয়া টাকা আদায় না হওয়া এবং লবণের দাম বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন কারণে এবার জমেনি খুলনার কোরবানীর পশুর চামড়ার বাজার। ফলে সরকার ঘোষিত মূল্যের অনেক কম দামে বিক্রি হয়েছে চামড়া। নিরুপায় হয়ে বিক্রেতারা স্বল্প মূল্যে চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন।
এবারের ঈদ-উল-আযহায়ও বরাবরের মতই খুলনা মহানগরীর পাওয়ার হাউজ মোড়ে কোরবানীর পশুর চামড়া কেনাবেচা হয়। ঈদের দিন সকাল থেকে রাত অব্ধি পর্যন্ত চলে বেচাবিক্রি। স্থায়ী, ভ্রাম্যমাণ ও মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীদের আনাগোনায় মুখরিত ছিল পাওয়ার হাউজ মোড়। খুলনায় স্থায়ী মার্কেট না থাকায় ব্যবসায়ীরা চামড়া কেনাবেচা করেন সড়কের উপরই। মূলত পুঁজি সংকট ও সংরক্ষণের স্থান না থাকায় চাহিদা অনুযায়ী চামড়া কেনা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে, সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে তুলনামূলক কম দামে চামড়া ক্রয় করেছেন ব্যবসায়ীরা। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভ্রাম্যমাণ, মৌসুমি ব্যবসায়ী ও কুরবানিদাতারা।
সূত্র মতে, সরকারের পক্ষ থেকে ঢাকা জেলায় প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়া ৫৫- ৬০ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫০- ৫৫ টাকা নির্ধারণ করা হলেও চামড়া বিক্রি করতে গেলে সে মূল্য দেননি স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। স্থানীয় বাজারে বড় গরুর চামড়া ৫শ’ থেকে সাড়ে ৫শ’ টাকা, ছোট গরুর চামড়া ৩শ’ টাকা এবং ছাগলের চামড়া নাম মাত্র দামে বিক্রি হয়েছে।
এতে ক্ষুব্ধ হন খুচরা চামড়া বিক্রেতারা। বিশেষ করে বিভিন্ন মাদ্রাসায় দানকৃত চামড়ার ন্যায় সংগত মূল্য না পেয়ে হতাশ হয়েছেন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ।
জানা গেছে, নগরীর শেখপাড়া চামড়াপট্টি তার অস্তিত্ব হারিয়েছে ২০১৯ সালে। এখন সেখানে কোনো চামড়ার দোকান নেই। ঈদে চামড়া ব্যবসায়ীরা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে চামড়া ক্রয় এবং সাময়িকভাবে সংরক্ষণ করেন। এছাড়া খুলনায় চামড়া বেচাকেনার জন্য নতুন কোনো বাজারও তৈরি হয়নি। ফলে সংরক্ষণের জায়গা না থাকায় প্রতিবছর ঈদ-উল-আযহায় বিপুল সংখ্যক চামড়া নিয়ে বিপাকে পড়েন ব্যবসায়ীরা। এ অবস্থায় এবারও শের-এ বাংলা সড়ক এবং শেখপাড়া বি কে রায় সড়কেই চামড়া সংরক্ষণের চেস্টা করেন তারা।
মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা আবুল হোসেন জানান, পাঁচটি গুরুর চামড়া নিয়ে এসেছিলাম। দুই হাজার টাকায় বিক্রি করেছি। একদিন রাখলে পঁচে যাবে বলে পানির দামে বিক্রি করে দিয়েছি। এমন চলতে থাকলে মাদ্রাসা চালাতে অসুবিধা হয়ে যাবে।
এদিকে চামড়া ব্যবসায়ীরা জানান, বর্তমানে নগরীর জিরো পয়েন্টে দুটি গুদামে এবং নগরীর ট্রাক টার্মিনালের পাশে এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে চামড়া মজুত করা হয়। ছোট ব্যবসায়ীরা সারা বছর চামড়া কিনে এ দুই স্থানেই মজুত করেন। কিন্তু কোরবানির ঈদে বিপুল পরিমাণ চামড়া আসায় সেখানে মজুত রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
খুলনা কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক কার্তিক ঘোষ বলেন, খুলনার চামড়া ব্যবসায়ীদের বিপুল পরিমাণ টাকা ঢাকার ট্যানারি মালিক ও আড়তদারদের কাছে বকেয়া রয়েছে। এ ঈদেও কেউ টাকা পরিশোধ করেননি। ফলে এ বছর বেশি চামড়া কেনার মতো পুঁজি ছিল না কারও কাছে। ব্যাংকও চামড়া ব্যবসায়ীদের ঋণ দেয় না। ফলে সংরক্ষণের জায়গার মতো পুঁজি সংকটেও ভোগেন তারা।
খুলনা জেলা কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মোঃ আব্দুস সালাম ঢালী জানান, এবার ঈদে ৫০ হাজার গরু ও ৩০ হাজার ছাগলের চামড়া কেনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। তবে কাঙ্খিত পরিমাণ চামড়া সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। এর অন্যতম কারণ পুঁজি সংকট এবং সংরক্ষণের জায়গার অভাব।
তিনি আরো জানান, খুলনায় স্থায়ী কোন চামড়ার মার্কেট না থাকায় তারা সড়কের উপর অস্থায়ী ভাবে চামড়া কেনাবেচা ও প্রক্রিয়াজাত করেছেন। এছাড়া ট্যানারি মালিকদের কাছে খুলনার ব্যবসায়ীদের কোটি কোটি টাকা বকেয়া পাওনা থাকায় তারা প্রত্যাশা অনুযায়ি চামড়া কিনতে পারেননি তারা।

