স্থানীয় সংবাদ

মণিরামপুরে বাওড় দখলে নিতে প্রভাবশালীদের মধ্যে চলছে রশি টানাটানি

# প্রকৃত মৎস্যজীবীরা কর্মহীন হয়ে পড়েছে,পরিবার-পরিজন নিয়ে চলছে মানবেতর জীবনযাপন #

মোঃ আব্বাস উদ্দীন, মণিরামপুর(যশোর)প্রতিনিধিঃ মণিরামপুরে সরকারি জলমহল (বাওড়) দখলে নিতে প্রভাবশালীদের মধ্যে চলছে রশি টানাটানি। মাছ ধরে জীবিকা নির্ভর মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের দরিদ্র জনগোষ্ঠীরা এখন মৎস্য শিকার করতে না পেরে কর্মহীন হয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে অভাব-অনটনে দিনাতিপাত করছেন। বিগত সময়ে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে মৎস্যজীবি না হয়েই প্রভাব খাটিয়ে হয়েছেন মৎস্যজীবী সদস্য। এসব অনিয়মের কারণে সম্প্রতি বাওড় দখলে নিতে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। এসব সৃষ্ট জটিলতার কারণে প্রকৃত মৎস্যজীবীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকারি জলমহল (বাওড়) মৎস্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে নেয়ার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে সরকার। প্রাথমিক অবস্থায় উপজেলার ৫টি বাওড়ের মধ্যে ৩টি বাওড় অচিরেই সংশ্লিষ্ট ওই মন্ত্রাণয়ে ন্যাস্ত হতে চলেছে বলে সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় ঝাঁপা, পারখাজুরা, খেদাপাড়া, খাটুরা ও হরিহরনগর এই ৫টি বাওড় ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে মৎস্যজীবী পরিচালিত সমবায় সমিতির কাছে ইজারা দেওয়া হয়। কিন্তু মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি ইজারা পেলেও প্রভাবশালীরা বিপুল অংকের টাকা বিনিয়োগ করায় বাওড়ের কর্তৃত্ব তাদের হাতে চলে যায়। আর প্রকৃত মৎস্যজীবীরা মজুরী হিসেবে বাওড়ে ফাইফরমাশ খাটেন। কার্যক্রম নিষিদ্ধ বিগত সরকারের আমলে প্রায় সব বাওড় তৎকালিন ক্ষমতাসীন প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। কিন্তু আওয়ামীলীগ সরকারের পতনের পর এসব বাওড়ের মাছ লুটপাট হলে ইজারাদাররা প্রভাবশালীদের অনুকুল লিখে দেয়। এরপরও বাওড়ে এক কেন্দ্রীক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা না পাওয়ায় সৃষ্ট দুই পক্ষের দ্বন্দ্বের জেরে একপক্ষ মাছ ধরতে অপর পক্ষের বাঁধার মূখে পন্ড হয় এবং সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। গত ৭ এপ্রিল খাটুরা বাওড়ে একপক্ষ মাছ ধরতে গেলে অপর পক্ষের বাঁধায় সংঘর্ষে রুপ নিলে ইউএনও, এ্যাসিল্যান্ড, ওসি ঘটনাস্থলে গিয়ে দুই পক্ষকে শান্ত করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ধরা মাছ ঘটনাস্থলেই জনসম্মুখে নিলামে বিক্রি করেন। এর আগে এ পর্যায় ১৯ মার্চ পারখাজুরা বাওড়ে মাছ ধরা নিয়ে সংঘর্ষে ইজারাদার হাকিমপুর-পারখাজুরা মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সাধারন সম্পাদক মলয় কুমার মন্ডলসহ কয়েকজন আহত হন। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করে।
সূত্র আরও জানায়, ১৯৮৯ সালের ৩ এপ্রিল ভূমি মন্ত্রণালয়,মৎস্যমন্ত্রণালয়ের ও ইফাদ (আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল)-এর যৌথ সমঝোতা চুক্তিতে ৫০ বছরের জন্য বাওড় পরিচালনার দায়িত্ব পায় ইফাদ। পারখাজুরা বাওড়ের ৬৬ একরের মধ্যে ৪০ একর আব্দুল মজিদ মহলদার নামের এক মৎস্যজীবী ৫০ বছরের জন্য লীজ পেলেও মেয়াদ শেষে ২০২২ সালে ৬ বছরের জন্য ইজারা পায় হাকিমপুর-পারখাজুরা মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি। নানা জটিলতায় ঝাঁপা বাওড় ও হরিহরনগর বাওড় থেকে সরে দাড়ায় ইফাদ। বাকী তিন বাওড়ে ব্রাক-এর মাধ্যমে বিনিয়োগ করে প্রকৃতি মৎস্যজীবীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে ইফাদ। ইফাদের নিয়ন্ত্রনে চলে প্রকৃত মৎস্যজীবী সদস্য বাছাই এবং মৎস্যজীবীদের নিয়ে গঠিত হয় সমবায় সমিতি।
খাটুরা বাওড় মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির আলতাফ হোসেন জানান, ইফাদের নিয়ন্ত্রণে থাকাকালিন প্রকৃত মৎস্যজীবীরা উপকৃত হন। পরবর্তিতে ১০ বছর অন্তর ইফাদ মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির কাছে বাওড় ইজারা দেয়। কিন্তু মৎস্যজীবীদের মধ্যে ঐক্য বিনষ্ট হলে সৃষ্ট দ্বন্দ্বের জের পড়ে বাওড়ে। ক্ষমতার পালাবদলে হাতবদল হয় বাওড়ের নিয়ন্ত্রন। এসব কারনে ভূমি মন্ত্রণালয় ফের এসব বাওড় নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। কিন্তু ইফাদের চুক্তি মোতাবেক এসব বাওড়ের মেয়াদ বাকী থাকায় উচ্চ আদালতে মামলা ঠুকে দেয় ইজারাদার পক্ষ। যে কারনে পূর্ণ প্রতিষ্ঠা নিতে ব্যর্থ হয় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়।
এদিকে ওই সময় অনেকেই প্রকৃত মৎস্যজীবী না হলেও স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে একটি প্রতয়নপত্র ও যে কোন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে এফিডেভিট করে মৎস্যজীবী সদস্য বনে যান। ২০১৮ সালের দিকে প্রকৃত মৎস্যজীবীদের নিবন্ধিত কার্ড প্রদান করা হয়। উপজেলায় ২৭ হাজার ১শ’৮১ জন মৎস্যজীবী রয়েছেন। যার মধ্যে নারী মৎস্যজীবী রয়েছে ২০১ জন। রমজান আলী, হারুন অর রশিদ, কার্ত্তিক মন্ডল, দুলাল চন্দ্র, শ্যামল বিশ্বাসসহ একাধিক মৎস্যজীবী ক্ষোভের সাথে জানান, মাছ ধরতে না পারায় তারা কর্মহীন হয়ে দারুন কষ্টে দিনাতিপাত করছেন। উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সেলিম রেজা জানান,প্রাথমিকভাবে উপজেলার তিনটি বাওড় (খাটুরা, খেদাপাড়া ও হরিহরনগর) মৎস্যমন্ত্রণালয়ে ফিরিয়ে নিতে কাজ চলমান রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button