স্থানীয় সংবাদ

উপকূলের ৭৩ভাগ মানুষ সুপেয় পানি থেকে বঞ্চিত

এইচ.এম.দুলাল মোংলা (বাগেরহাট) প্রতিনিধি ঃ বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকা মানুষের জীবনযাত্রার সবচেয়ে বড় ও প্রধান সমস্যা হলো সুপেয় বা খাবার পানির তীব্র সংকট। চারদিকে প্রচুর পানি থাকলেও, লবণাক্ততার কারণে তা পান করার অনুপযুক্ত। তাই উপকূলের ৭৩ ভাগ মানুষ সুপেয় পানি থেকে বঞ্চিত। দেড় কোটি মানুষ ভূগর্ভস্থ লবণাক্ত পানি পানে বাধ্য হচ্ছে। কেবল বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার ৬৫% মানুষের সুপেয় পানি সংগ্রহের কোন ব্যবস্থা নেই। বাকী ৩৫ ভাগ মানুষদের বৃষ্টির পানি সংগ্রহের জন্য সরকারি এবং বেসরকারি ভাবে পানির ট্যাংকি বিতরণ করা হলেও তা দিয়ে মাত্র ৪ থেকে ৬ মাসের পানি ধারন করা সম্ভব। বাগেরহাটের মোংলা উপজেলা ৬টি ইউনিন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত। উপজেলার জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে উপজেলার পানির উৎসগুলোর মধ্যে চাঁদপাই ইউনিয়নে ২১৩০১ জনসংখ্যার জন্য পানি সংরক্ষনের পুকুর রয়েছে মাত্র একটি। আর পলিমার ট্যাংকি রয়েছে ১৫৪০টি। বুড়িরডাঙ্গা ইউনিয়নে ১৬২১৭ জন সংখ্যার জন্য বৃষ্টির পানি সংরক্ষনের একটি পুকুর ১১৩০টি পলিমার ট্যাংকি রয়েছে। মিঠাখারী ইউনিয়নে ১৮৫৫১ জন সংখ্যার জন্য পানি সংরক্ষনের ৫টি পুকুর ও ১২৩০টি পলিমার ট্যাংকি রয়েছে। চিলা ইউনিয়নের ২০৪৩৭ জন জন সংখ্যার জন্য বৃষ্টির পানি সংরক্ষনের জন্য ৫টি পুকুর ও ১৩৪৪ টি পলিমার ট্যাংকি রয়েছে। সোনাইলতলা ইউনিয়নে ১৯১১৩ জন সংখ্যার জন্য ১টি পুকুর ও ১১১০ টি পলিমার পানির সংরক্ষনের ট্যাংকি রয়েছে। সুন্দরবন ইউনিয়নে ২৪২৩১ জন সংখ্যার জন্য ৭টি পুকুর ১২৫৭টি ট্যাংকি রয়েছে। পৌরসভার ৪১৬১৩ জন সংখ্যার জন্য বৃষ্টির পানি সংরক্ষনের একটিও সরকারী পুকুর নেই। ট্যাংকি বিতরন করা হয়েছে মাত্র ৫০টি। তবে পাইপ লাইনের মাধ্যমে পৌর কর্তৃপক্ষ ২৬০০ পরিবারকে জমানো বৃষ্টির পারি সরবরাহ করে থাকে। তাও সংযোগ পাওয়া পরিবারগুলোর চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল।
সরকারী তথ্য বলছে. মোংলা উপজেলায় ৬টি ইউনিয়নে মোট পরিবার বা খানার সংখ্যা ৪১৫৬১টি। সেখানে সরকারী ভাবে পানির ট্যাংকি দেওয়া হয়েছে ৭৬৬১টি। বিভিন্ন এনজিও কর্তৃক ট্যাংকি বিতরণ করা হয়েছে ১২২৮৩টি। সব মিলিয়ে ট্যাংকি বিতরণ করা হয়েছে ১৯৯৪৪টি। সরকারী ট্যাংকি পায়নি ২১৬১৭টি পরিবার। আর পৌর সভায় হোল্ডিং সংখ্যা ৬৩০০। সচল পানির সংযোগ রয়েছে ২৬০০ টি। পানির সংযোগ দেওয়া হয়নি ৩৭০০ হোল্ডিং বা বাড়ীতে। আসন্ন জাতীয় বাজেট কে সামনে রেখে ক্লাইমেট অ্যাকশন ফোরাম উপকুলীয অঞ্চলের সুপেয় পানির সংকটের চিত্র তলে ধরেছে। ফোরামের মোংলা উপজেলার সভাপতি মো নুর আলম শেখ জানান, মোংলাসহ দক্ষিনাঞ্চলে জলবায়ু সংকট প্রতিনিয়ত বাড়ছে। তিনি বলেন, লন্ডন ভিত্তিক গবেষনা সংস্থা ম্যাপলক্রাফট বিশ্বের ১৭০টি দেশের উপর জরিফ চালিয়ে ১৬টি দেশকে সর্বাপেক্ষা ঝুর্কিপূর্ণ দেশ হিসেবে চিহ্ণিত করেছে। এর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। ২০২৩ নালের জরিফে জলবায়ু দূর্যোগের ঝুঁকির দিক থেকে বিশ্বে ঝুকি সুচক ২০২৩ বাংলাদেশকে নবম স্থানে রেখেছে। এতে করে ভবিষ্যতে জলবায়ুর ক্ষতির প্রভাবে উপকুলীয় এলাকায় পানির সংকট আরো তিব্র হতেপারে। নুর আলম শেখ আরো বলেন, এ উপকুলে বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট নতুন করে সৃষ্টি হয়নি। বরং জলাশয় কিংবা গভীর নলকুপের মতো উৎস থাকলেও মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক,লবণাক্ততা,ও আয়রনের কারণে তা পান করার উপযোগী নয়। তাই এসব এলাকার বাসিন্ধাদের ,বিশেষ করে নারীদের পানি সংগ্রহের ভোগান্তি ও নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। মোংলা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাক্তার মো শাহীন জানান, হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা নানা বয়সের নারীদের জরায়ু রোগ, এ্যাজমা- শাস কষ্ট ও দাউদ একজিমার মতো আক্রান্ত। এদের মধ্যে বয়স্ক নারীদের অনেকেরই দেখা যায় গাইনী সমস্যা । যেটি জলবায়ু পরিবর্তন জণিত কারনে বা এর প্রভাবে ওইসব নারীরা আক্রান্ত হচ্ছেন।
মোংলা উপজেলার চিলা ইউনিয়নের কলাতলা এলাকার বাসিন্ধা এনজিও কর্মি দিপালি রায় জানান, নদীর পাশে তাদের বসবাস। তাই জন্মের পর থেকে লবন পানি ব্যবহার করে আসছেন তারা। কারণ, একটি তিন হাজার লিটারের ট্যাংকি পেয়েছেন সরকারী ভাবে। বর্ষার সময়ে পানি সংরক্ষন করলে মাত্র তিন মাসে শেষ হয়ে যায়। বাকী সময় দুর থেকে পুকুরের পানি সংগ্রহ করে খেতে হয়। আর সংগ্রহ করতে না পারলে লবণ পানিই ভরসা।
খুলনা বিশ্বিবিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও গবেষক সামিউল হক বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিত দুর্যোগের (যেমনÑ সিডর, আইলা) ফলে উপকূলের মাটি ও পানির উৎসে অতিরিক্ত লবণ ঢুকে পড়েছে। শুষ্ক মৌসুমে পানির স্তর অনেক নিচে নেমে যাওয়ায় টিউবওয়েলে পানি ওঠে না, বিশেষ করে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট অঞ্চলে। একই সাথে পানির উৎস পুকুর, খাল ও অন্যান্য উন্মুক্ত জলাশয়গুলো প্রভাবশালীরা দখল বা ভরাট করে ফেলায় খাবার পানির আধার কমে যাচ্ছে। এর ফলে বাধ্য হয়ে লবণাক্ত বা দূষিত পানি পান করার ফলে স্থানীয় মানুষজন, বিশেষ করে নারীরা, কিডনির জটিলতা, চর্মরোগ এবং পানিবাহিত নানা রোগে ভুগছেন। দিলীপ কুমার দত্ত বলেন, আমরা বর্তমানে যে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করছি, ওই ভূগর্ভস্থ পানি পূরণ হতে কমপক্ষে ৬০০ বছর লাগবে। বর্তমানে আমাদের উপকূলীয় এলাকায় কমপক্ষে ৯৮ শতাংশ মানুষ ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে যে পরিমাণ পানি তোলা হচ্ছে তা পূরণ হচ্ছে না। যেসব জলাশয় ছিল তা ভরাট হয়ে গেছে। এসব কারণে রেইন ওয়াটার হার্ভেস্ট বা বৃষ্টির পানি ধরে রেখে ব্যবহার একটি জনপ্রিয় মাধ্যম। তবে, এটা শুধু স্বল্প সময়ের জন্য খাবার পানির চাহিদা পূরণ করছে। মনে রাখতে হবে, মিঠা পানির চাহিদা শুধু মানুষের নয়, পরিবেশের প্রতিটি গাছপালা ও জীবজন্তুর জন্যও প্রয়োজন। বৃষ্টির পানি ধরে রেখে শুধু মানুষের খাবার পানির চাহিদা মিটতে পারে, কিন্তু পরিবেশের নয়। এর জন্য প্রয়োজন প্রকৃতিনির্ভর সমাধান। তবে এ ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কারণ, উৎসের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার বন্ধ করে দিতে হবে। সে ক্ষেত্রে এলাকাভিত্তিক বড় বড় পুকুর, খাল, জলাশয় খনন করে তাতে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। পুকুর ও ড্রামে পানি থাকার মধ্যে পার্থক্য আছে। পুকুরে পানি থাকলে গাছপালা, জীবজন্তু সেখান থেকে পানি পায়। সরকার ও বিভিন্ন সংস্থা বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ পুকুর,বালি ফিল্টার এবং গভীর নলকূপ স্থাপনের মাধ্যমে এই সংকট সমাধানের চেষ্টা করছে, কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত।
সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম এমপি বলেন,পানি হচ্ছে মানুষের মৌলিক অধিকার। এ অধিকার নিশ্চিত করতে সরকারী কর্মকান্ড অব্যাহত থাকবে। প্রাকৃতিক ভাবে উপকুলে মানুষদের চাহিদা পুরণে উদ্যোগ নেওয়া হবে। দুর করা হবে সকল প্রতিবন্ধকতা। সরকারী নতুন নতুন প্রকল্প বরাদ্ধ করে দ্রুত এ সমস্যা সমাধানের ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী ।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button