স্থানীয় সংবাদ

দেশের খাদ্য ঘাটতি পূরণে ভূমিকা রাখছে ‘খুলনাঞ্চল’

# অর্থবছর ২০২৬-২০২৭’র রোপা আমন আবাদ #
# আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ২৮৯৮৫৯ হেক্টর, রোপনের অগ্রগতি হয়েছে ৩৫%
# ৪৪ হাজার কৃষককে প্রণোদনা প্রদান, চাল উৎপাদনের সম্ভবনা ৮৫৬৯৭৪ মেঃ ট
# সংশ্লিষ্টরা বলছেন : উৎপাদিত চাল খাদ্য চাহিদা পূরণে অগ্রনী ভূমিকা রাখবে

মোঃ আশিকুর রহমান : চলতি ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে খুলনাঞ্চলে রোপা আমন ধানের আবাদ ও উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা শতভাগ পূরণের সম্ভবনাকে সামনে রেখে জেলাগুলোতে এখন একযোগে বিরতিহীনভাবে রোপনের কার্যক্রম নিয়ে চরম ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকেরা। জেলাগুলোতে রোপা আমন আবাদের রোপন কার্যক্রমের পাশাপাশি ক্ষেতে সার ছিটানো, আগাছা পরিষ্কারসহ নানাবিধ পরিচর্যার কাজও চলছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উৎপাদন বছরে রোপা আমন আবাদ ও উৎপাদন শতভাগ পূরণ করে খুলনাঞ্চল দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ন অবদান রাখার পাশাপাশি এই অঞ্চলের খাদ্য ঘাটতি ও চাহিদা পূরণেও অগ্রনী ভূমিকা রাখবে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খুলনাঞ্চলের সর্বশেষ তথ্য সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে খুলনাঞ্চলে রোপা আমন আবাদের (হাইব্রীড, উফশী ও স্থানীয় জাত) লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে ২ লাখ ৮৯ হাজার ৮৫৯ হেক্টর জমি। যার মধ্যে খুলনা জেলায় ৮৮ হাজার ৩৫১ হেক্টর, বাগেরহাট জেলায় ৬৮ হাজার ৮৯৩ হেক্টর, সাতক্ষীরা জেলায় ৮৯ হাজার ১৫০ হেক্টর ও নড়াইল জেলায় ৪৩ হাজার ৪৬৫ হেক্টর জমি। আবাদের লক্ষ্যমাত্রা শতভাগ পূরণের বিপরীতে অঞ্চলের সম্ভাব্য চালের উৎপাদন ধরা হয়েছে ৮ লাখ ৫৬ হাজার ৯৭৪ মেট্রিক টন। সর্বশেষ তথ্যনুসারে অঞ্চলে রোপা আমন আবাদের অগ্রগতি হয়েছে ১ লাখ ১ হাজার ৪৯৭ হেক্টর জমি, যার হার ৩৫%। যার মধ্যে খুলনা জেলায় ৬ হাজার ৬৯ হেক্টর, হার ৭%, বাগেরহাট জেলায় ৫ হাজার ৭৯৮ হেক্টর, হার ৮%, সাতক্ষীরা জেলায় ৫১ হাজার ৯৮৪ হেক্টর, হার ৫৮% ও নড়াইল জেলায় ৩৭ হাজার ৬৪৬ হেক্টর জমি, হার ৮৭%। উৎপাদন অর্থবছরে খুলনাঞ্চলে রোপা আমন আবাদকে আরও গতিশীল করে তুলতে ৪৪ হাজার কৃষককে প্রণোদনার আওতায় আনা হয়েছে, প্রণোদনার উপকরণ হিসাবে তাদের কৃষককে ২২০ মেট্রিক টন উফশী আমন জাতের বীজ, ৪৪০ মেট্রিক টন ডিএপি এবং ৪৪০ মেট্রিক টন এমওপি সার প্রদান করা হয়েছে। যার মধ্যে, খুলনা জেলায় ১৫ হাজার, বাগেরহাট জেলায় ৮ হাজার, সাতক্ষীরা জেলায় ১৫ হাজার ও নড়াইল জেলায় ৬ হাজার কৃষক অঞ্চল কর্তৃক এ প্রণোদনার আওতায় সহায়তা গ্রহন করেছে। প্রণোদনার অর্ন্তভূক্ত প্রতি কৃষককে ৫ কেজি উফশী আমন বীজ, ১০ কেজি ডিএপি এবং ১০ কেজি এমওপি সার প্রদান করা হয়েছে বলে তথ্য সূত্রে জানা গেছে।
বাগেরহাট জেলার মোড়লগঞ্জ উপজেলার বহরবুনিয়া গ্রামের কৃষক জাহিদুল ইসলাম জানান, প্রায় আড়াই একর জমিতে আমন ধানের চাষাবাদ করছি। ক্ষেতে বর্তমানে রোপনের কার্যক্রম চলছে। প্রণোদনা হিসাবে উপজেলা কৃষি অফিস থেকে ৫ কেজি উফশী আমন জাতের বীজ, ১০ কেজি ডিএপি এবং ১০ কেজি এমওপি সার প্রদান করেছে। এছাড়া সার্বক্ষনিক উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সার্বিক বিষয়ে পরামর্শ ও সহয়তা প্রদান করছেন। কৃষক শাহিন জানান, গত কয়েক বছর বৃষ্টিপাত কম থাকলেও এ বছর বৃষ্টির কমতি নেই, পরিমিত বৃষ্টি হচ্ছে। ক্ষেতে যথেষ্ট পানি আছে। রোপন চলছে। চলছে সার প্রয়োগ, আগাছা দমন ও পরিচর্যার কাজ। তাছাড়া বাজারে সবজির দাম বেশ ভালো পাওয়া যাচ্ছে, সবজির দিকেও বেশ সময় দিচ্ছি। প্রতি বছরই আমন চাষাবাদ ভালো হয়, এবছরও ভালো হবে আশা রাখি। খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলা কৃষি অফিসের অর্ন্তগত হালিয়া ব্লকের দায়িত্বরত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. তারিকুল ইসলাম জানান, আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ৭৫০ হেক্টর জমি। অগ্রগতি হয়েছে ৬০ হেক্টর, হার ৯%। এছাড়া ২৬০ জন কৃষককে প্রণোদনা হিসাবে সার ও বীজ প্রদান করা হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে রোপনের অগ্রগতি শতভাগ সম্পন্ন হবে বলে আশাবাদি। কৃষকেরা বিরতিহীনভাবে আমন ধানের চারা রোপনে চরম ব্যস্ত। কৃষকদের সাথে সার্বক্ষনিক যোগাযোগ রেখে পরামর্শ প্রদান ও সহয়তা অব্যাহত আছে। বাগেরহাট জেলার মোড়লগঞ্জ উপজেলার বহরবুনিয়া ইউনিয়নের দায়িত্বরত উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তা মোঃ আমিরুল ইসলাম জানান, আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ও অগ্রগতি অর্জনে কৃষককে সার্বিক বিষয়ে পরামর্শ প্রদানের পাশাপাশি সকল ধরনের সহয়তা করা হচ্ছে। চলতি বছরে ৪৫ জন কৃষককে প্রণোদনা হিসাবে সার ও বীজ প্রদান করা হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে রোপনের অগ্রগতি শতভাগ সম্পন্ন হবে বলে আশাবাদি। খুলনার দিঘলিয়া উপজেলা কৃষি অফিসার মো. শফিকুল ইসলাম জানান, চলতি উৎপাদন বছরে উপজেলার রোপা আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ১,৮২৭ হেক্টর, ইতোমধ্যে অগ্রগতি হয়েছে ৯৬৬ হেক্টর, হার ৫০%। ৫০০ জন কৃষককে প্রণোদনা হিসাবে সার ও বীজ প্রদান করা হয়েছে। অগ্রগতির শতভাগ পূরণে মাঠে আবাদের কার্যক্রম চলছে। উপজেলা কৃষি অফিস থেকে কৃষকদের সার্বক্ষনিক পরামর্শ প্রদানসহ সার্বিক বিষয়ে সহায়তা করা হচ্ছে। আশাকরি শতভাগ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সক্ষম হবো। নড়াইল জেলার কালিয়া উপজেলার কৃষি অফিসার মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, চলতি উৎপাদন বছরে উপজেলার রোপা আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে ১২,০৬০ হেক্টর, ইতোমধ্যে অগ্রগতি হয়েছে ৮,৮৪৫ হেক্টর, যার হার ৭১%। এছাড়া চলতি অর্থবছরের আওতায় রোপা আমন আবাদে ১৬৬০ জন কৃষককে প্রণোদনা হিসাবে সার ও বীজ প্রদান করা হয়েছে। অগ্রগতির শতভাগ পূরণে মাঠে আবাদের কার্যক্রম চলছে। উপজেলা কৃষি অফিস থেকে কৃষকদের সার্বক্ষনিক পরামর্শ প্রদানসহ সার্বিক বিষয়ে সহায়তা করা হচ্ছে। আশাকরি শতভাগ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সক্ষম হবো। সাতক্ষীরা সদর উপজেলা কৃষি অফিসার প্লাবনী সরকার জানান, চলতি উৎপাদন বছরে উপজেলার রোপা আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়ে ১৭,৫৮৫ হেক্টর, ইতোমধ্যে অগ্রগতি হয়েছে ১২,২৪৪ হেক্টর, যার হার ৭০%। এছাড়া চলতি অর্থবছরের আওতায় রোপা আমন আবাদে ৩,০০০ জন কৃষককে প্রণোদনা হিসাবে সার ও বীজ প্রদান করা হয়েছে। অগ্রগতির শতভাগ পূরণে মাঠে আবাদের কার্যক্রম চলছে। কৃষকেরা ক্ষেতে রোপন, সার ছিটানোসহ পরিচর্যা নিয়ে বেশ ব্যস্ত। আমরা সার্বক্ষনিক কৃষকদের সার্বিক বিষয়ে পরামর্শ প্রদান ও সহায়তা করছি। আশাকরি শতভাগ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সক্ষম হবো। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বাগেরহাট জেলার উপ-পরিচালক মো. মোতাহার হোসেন জানান, চলতি উৎপাদন বছরে বাগেরহাট জেলায় রোপা আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে ৬৮,৮৯৩ হেক্টর জমি। বিপরীতে অগ্রগতি হয়েছে ৫,৭৯৮ হেক্টর, হার ৮%। বাগেরহাট ঘের অঞ্চল, তাছাড়া অতি বর্ষার কারনে এই জেলার কৃষকেরা লেট ভ্যারাইটি করে (বিআর-২৩ জাত) আবাদ করে থাকে, যে কারণে শেষের দিকে গিয়ে আমাদের আবাদের অগ্রগতি বেড়ে যায়। জেলা হতে ৮ হাজার কৃষককে প্রণোদনা হিসাবে উফশী ধানের জাতের বীজ ও সার প্রদান করা হয়েছে। অতি বৃষ্টির কারণে নিমাঞ্চল তলিয়ে যাওয়ার দরুন বর্তমানে বাজারে সবজির মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় রোপা আমন রোপনের কার্যক্রমের পাশাপাশি সবজি নিয়েও জেলার কৃষকের ব্যস্ত। আশাকরি আবাদের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার শতভাগ পূরণ করে চাল উৎপাদনে এই জেলার কৃষকেরা অগ্রনী ভূমিকা রাখবে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খুলনা অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ মো. রফিকুল ইসলাম জানান, খুলনাঞ্চলে রোপা আমন আবাদকে আরও গতিশীল করতে প্রণোদনা হিসাবে কৃষকদের মাঝে উন্নত বীজ ও সার প্রদান করা হয়েছে। আশা রাখি, আবাদের লক্ষ্যমাত্রার শতভাগ পূরণ করে এই অঞ্চলের সম্ভাব্য উৎপাদিত চাল ও আয় দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখার পাশাপাশি কৃষকদেরও আর্থিকভাবে লাভবান ও আত্মনির্ভর করে তুলতে অগ্রনী ভূমিকা পালন করবে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button