কলকাতায় অগ্নিকাণ্ডে ৯ বাংলাদেশি নিহত

# ৫ বাংলাদেশীর পরিচয় সনাক্ত #
# লাশ দেশে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে #
প্রবাহ রিপোর্ট ঃ কলকাতায় একটি হোটেলে ভয়াবহ আগুনে শিশুসহ অন্তত ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। তারা সবাই বাংলাদেশি। বুধবার (১৯ আগস্ট) ভোররাতে শহরের ফ্রি স্কুল স্ট্রিট এলাকায় এ অগ্নিকা- ঘটে। জানা গেছে, স্থানীয় সময় রাত ২টার দিকে নিউ মার্কেটের কাছে হোটেলটিতে আগুন লাগে। ওই সময় বেশিরভাগ অতিথি ঘুমিয়ে ছিলেন। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় কয়েকজন হোটেলের ভেতরে আটকা পড়েন। এসি বিস্ফোরণ থেকে আগুনের সন্দেহ ঃ প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, হোটেলের একটি এয়ার কন্ডিশনার (এসি) বিস্ফোরণ থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। তবে আগুনের প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। আগুনের খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় চারটি দমকলের গাড়ি। পাশাপাশি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দলের সদস্যরাও সেখানে গিয়ে উদ্ধারকাজে যোগ দেন। দমকলকর্মীরা হোটেলের ভেতরে আটকে পড়া অতিথিদের বের করে আনতে অভিযান চালান। পরে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। ঘটনার পর হোটেল ও আশপাশের এলাকায় উদ্ধার ও তল্লাশি অভিযান চালানো হয়। আগুনে আরও কেউ হতাহত হয়েছেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দুই দিনের ব্যবধানে দ্বিতীয় হোটেলে আগুন ঃ কলকাতার এই অগ্নিকা-ের মাত্র দুই দিন আগে পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার তারাপীঠে আরেকটি হোটেলে ভয়াবহ আগুনের ঘটনা ঘটে। ১৭ আগস্ট ভোরে তারাপীঠের হোটেল বিদেষিণীতে আগুনে অন্তত ৮ জন নিহত এবং আরও কয়েকজন আহত হন। পাঁচতলা ওই হোটেলের নিচতলায় ভোর সাড়ে ৪টার দিকে আগুন লাগে। তখন অধিকাংশ অতিথি ঘুমিয়ে ছিলেন। হোটেলটি তারাপীঠ মন্দিরের কাছে একটি পবিত্র পুকুরের পাশে অবস্থিত। জানা গেলো কলকাতায় আগুনে নিহত ৫ বাংলাদেশির পরিচয় ঃ
ভারতের কলকাতার নিউ মার্কেটসংলগ্ন মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকা-ে এখন পর্যন্ত ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে ৮ জন বাংলাদেশি এবং একজন হোটেলকর্মী। নিহতদের মধ্যে ৬ জন পুরুষ, ২ জন নারী ও ১০ বছরের একটি শিশু রয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ছয়জন। নিউ মার্কেট থানার তথ্য অনুযায়ী, নিহত ৯ জনের মধ্যে এখন পর্যন্ত পাঁচজনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন কুষ্টিয়ার বাসিন্দা দেবাশীষ দত্ত, তার স্ত্রী শারমিন আফসানা, সন্তান স্বর্ণশিষ দত্ত এবং শ্বশুর মো. আকরাম। অপরজন ঢাকার আমিনবাজারের মধ্যবয়সী আহমেদ বাবু। নিহতরা সবাই চিকিৎসার ভিসায় কলকাতায় এসেছিলেন বলে জানা গেছে। বাকি নিহতদের পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করছে পুলিশ। সব মরদেহ বর্তমানে পুলিশ মর্গে রাখা হয়েছে এবং আজই তাদের ময়নাতদন্ত হওয়ার কথা। কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, আহত ছয়জনকে চিকিৎসা দেওয়ার পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে মর্জিনা বেগম, তার সন্তান সিয়াম খান এবং কোহিনুর আক্তার বর্তমানে নিউ মার্কেট এলাকার একটি হোটেলে অবস্থান করছেন। ভয়াবহ রাতের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে মর্জিনা বেগম বলেন, আমরা শ্বাস নিতে পারছিলাম না। বাঁচার আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। চারদিকে শুধু কালো ধোঁয়া আর বাঁচার চিৎকার শুনতে পাচ্ছিলাম। সবাই বাঁচার জন্য আর্তনাদ করছিল। পরে কোনো রকমে জানালা ভেঙে স্থানীয়রা আমাদের বের করে আনেন। অন্যদিকে, রাতের ঘটনার কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন কোহিনুর আক্তার। তার কথায় এখনো আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট। তিনি বলেন, চারদিকে কালো ধোঁয়া। তখন শুধু চিৎকার করছিলাম-ভাইয়া, আমাদের বাঁচান, আমরা বের হতে পারছি না। অন্ধকারে লিফট চলছিল না। লোহার ছোট্ট সিঁড়ি, কিন্তু কালো ধোঁয়ার কারণে সেটাও দেখা যাচ্ছিল না। আমরা চারতলায় আটকে ছিলাম। সিঁড়ির ওপর আগুন জ্বলছিল। তিনি আরও জানান, একজন এসে জানালা খুলে দেন, যাতে একটু বাতাস ঢুকতে পারে। আর একজন বলছিলেন, আপা, চুপ থাকেন, আমরা চেষ্টা করছি।’ কিছুক্ষণ পর যেন আল্লাহর দূত হয়ে একজন আমাদের কাছে এলেন। তিনি বললেন, ‘আপা, আমার কাছে টর্চ লাইট আছে। সেই টর্চের আলো অনুসরণ করেই আমরা ছাদে উঠি। দীর্ঘক্ষণ ছাদে আটকে থাকার পর দমকলকর্মীরা এসে আমাদের উদ্ধার করেন। মঙ্গলবার গভীর রাতে নিউ মার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন্টারন্যাশনাল’ হোটেলে আগুন লাগে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সময় রাত আনুমানিক ২টা ২০ মিনিটে হোটেলের একটি কক্ষে আগুনের সূত্রপাত হয়। ওই সময় অধিকাংশ আবাসিক ঘুমিয়ে ছিলেন। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ও ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ায় আতঙ্ক তৈরি হয়। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, আগুনের পাশাপাশি ঘন কালো ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে অধিকাংশের মৃত্যু হয়েছে। দগ্ধ অবস্থায় কোনো মরদেহ উদ্ধার হয়নি। অচেতন অবস্থায় ৯ জনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাদের মৃত ঘোষণা করেন। গভীর রাতে আগুন লাগায় অনেকেই সময়মতো বিষয়টি বুঝতে পারেননি। ফলে বের হওয়ার আগেই হোটেলের বিভিন্ন অংশ ঘন ধোঁয়ায় ভরে যায়। দমকল সূত্রে জানা গেছে, ‘শিখা ইন্টারন্যাশনাল’ হোটেলে মোট ১৪ জন ছিলেন। পাশাপাশি আগুনের কারণে আশপাশের আরও চারটি হোটেল থেকেও মোট ৮০ জনকে উদ্ধার করা হয়। নিউ মার্কেটের মির্জা গালিব স্ট্রিট ও মারকুইস স্ট্রিট এলাকা কলকাতার ‘মিনি বাংলাদেশ’ হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশি পর্যটকদের অন্যতম পরিচিত এই এলাকায় একাধিক হোটেল ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। স্থানীয় হোটেল মালিকদের দাবি, মারকুইস স্ট্রিট এলাকার হোটেলে এ ধরনের অগ্নিকা-ের ঘটনা অত্যন্ত বিরল। ঘটনার তদন্ত পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ করছে বলে জানিয়েছেন তারা। তবে ঘটনার পর হোটেলটির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। হোটেল সূত্রের দাবি, ‘শিখা ইন্টারন্যাশনাল’ হোটেলে কোনো অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ছিল না। ফলে এত মানুষের প্রাণহানি কীভাবে ঘটল এবং হোটেলে পর্যাপ্ত অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে পুলিশ ও দমকল বিভাগ তদন্ত শুরু করেছে। লাশ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রস্তুতি ঃ ভারতের কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকা-ে নিহত ৯ জন বাংলাদেশির মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। কলকাতার Bangladesh Deputy High Commission in Kolkata ভারতীয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে দ্রুত লাশগুলো দেশে ফিরিয়ে আনার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।



