সুশাসনের পথে যেকোনো অন্তরায় উপড়ে ফেলতে চাই : খুলনায় আইনমন্ত্রী

রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স
সন্ত্রাস দমনে আইন সঙ্গতভাবে অগ্রসর হতে হবে
শিপইয়ার্ড সড়ক নির্মাণে মহাদুর্নীতির অভিযোগ
স্টাফ রিপোর্টার : খুলনা জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত এবং আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এমপি বলেছেন, সুশাসনের পথে যেকোনো অন্তরায় উপড়ে ফেলতে চাই। তিনি বলেন, যেকোনো রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স অবস্থা রয়েছে। যেকোনো অপরাধ দমনে বেআইনি ভাবে নয়, আইন সংগতভাবেই এগোতে চাই। কেউ মহা অপরাধী হলেও তাকে বেআইনিভাবে খুন হতে দেয়া যাবেনা। সন্ত্রাস দমনে আইন সঙ্গতভাবে অগ্রসর হতে হবে। যুব সমাজকে মাদক থেকে দূরে রাখার জন্য সরকার শিক্ষার উপর গুরুত্ব দিয়ে সাংস্কৃতিক কর্মকা- এবং খেলাধূলার উপর জোর দিয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
আজ সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টায় খুলনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে খুলনা জেলার আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, জননিরাপত্তা বিধান, মাদক ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং সার্বিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রম ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, দলীয়করণের কারণে বাংলাদেশে বিগত ১৭ বছরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মহাযজ্ঞ চলেছে। আমাদের প্রায় সাড়ে চার হাজার সহযোদ্ধাকে ক্রসফায়ারের নামে পাখির মতো গুলি করে হত্যা করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য-তৎকালীন স্বৈরাচার। আমাদের প্রায় ৭০০ সহযোদ্ধাকে গুম করে রেখেছেন, যাদের স্বজনেরা এখনও তাহাজ্জুদের নামাজের পরে পাটিতে বসে আল্লাহর কাছে দুই হাত তুলে ফরিয়াদ করেন-কখন তার স্বজন ফিরে আসবে।
আইনমন্ত্রী বলেন, শুধুমাত্র বিএনপি করার অপরাধে বিগত ১৭ বছরে বিএনপির ৬০ লক্ষের বেশি নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যা গায়েবি মামলা করা হয়েছিল, যে সমস্ত মামলার প্রায় ৯৯% ভিত্তিহীন ও ভুয়া। জামায়াতের ৫০ জন সহযোদ্ধাকে আন্দোলন করার সময় পাখির মতো গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। ৩৭ জন বিএনপি নেতাকর্মীকে বিগত ১৭ বছরে এভাবে হত্যা করা হয়েছিল। একইভাবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় গুলি করে হত্যা করা হয়েছে ১৪০০ মানুষকে, ৩০ হাজার মানুষকে পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়েছে। এবং যারা করেছিলেন, তাদের অনেকেই এখনো এই চাকরিতে বহাল আছেন।
তিনি আরও বলেন, এই সরকারের বয়স ছয় মাস। সরকারকে একটু সময় দিতে হবে আবর্জনা পরিষ্কার করার জন্য। আমরা সমস্ত অপরাধের বিচার করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। আমরা যদি এই সমস্ত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করতে না পারি, ইতিহাস আমাদেরকে ক্ষমা করবে না। আমরা উত্তরসূরিদের কাছে মেরুদ-হীন হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকব। আমরা সেই জেনারেশন হতে চাই না বলেই অত্যন্ত ধৈর্য সহকারে প্রধান মন্ত্রী সমস্ত পথ ও মতের মানুষকে সাথে নিয়ে এই দেশ পরিচালনা করার চেষ্টা করছেন। তিনি একটি পচে যাওয়া সমাজব্যবস্থাকে মেরামতের চেষ্টা করছেন। রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যে যে পরিমাণ পচন ধরেছিল, সে পচন পরিস্কার করার চেষ্টা করা হচ্ছে, সে পচনকে চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইন মন্ত্রী বলেন, ক্রসফায়ার যেহেতু আইনি কাঠামোর মধ্যে পড়ে না, ওই পথে আমরা যাব না। সন্ত্রাস দমনের জন্য ক্রসফায়ার করতে হবে নট নেসেসারি। সন্ত্রাস দমনের জন্য আমাদের যে আইন আছে, সে আইনই যথেষ্ট। সেই আইনকে যদি সংশোধন করে কোনো কঠিন প্রক্রিয়া আনতে হয়, সেটাও করব। বাট বেআইনি কোনো পথে আমরা হাঁটব না। আমাদের আইনি প্রক্রিয়াটা হবে, প্রয়োগটা হবে সম্পূর্ণভাবে মানবাধিকারের বেসিসে। আমাদের একটা সংবিধান আছে, মৌলিক অধিকার অনুসারে হবে। খুলনার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে পরিকল্পনা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
রুপসা ঘাটের অনিয়মের প্রসঙ্গ তুলে আইনমন্ত্রী বলেন, নদী পার হওয়ার পর মানুষের ব্যাগ পারাপারের জন্যও আলাদা চার্জ নেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি জানতে পেরে তিনি জেলা প্রশাসককে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। সম্ভব হলে পরদিন থেকেই সেখানে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে বলেও জানান তিনি।
রুপসা সেতুর অ্যাপ্রোচ সড়ক (শিপইয়ার্ড) নির্মাণে দুর্নীতির অভিযোগকে মহাদুর্নীতি হিসেবে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ৩ দশমিক ৭৫ কিলোমিটার সড়কটির কাজ ৯৫ শতাংশের বেশি শেষ হয়েছে দেখিয়ে চতুর্থবার প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছিল। অথচ প্রকল্পটির ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২৮০ কোটি টাকা।
তিনি বলেন, ২০২২ সালে টেন্ডার হওয়া সড়কটির প্রাথমিক ব্যয় ছিল ৩৫ থেকে ৪০ কোটি টাকার মতো। পরে তা বেড়ে ২৮০ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর প্রধানমন্ত্রী এটিকে শুধু দুর্নীতি নয়, মহাদুর্নীতি বলে মন্তব্য করেন। পরে মন্ত্রিসভা সচিবের নেতৃত্বে তদন্ত হয়। তদন্তে রুপসা ঘাট এলাকায় সড়ক নির্মাণকে ঘিরে বড় ধরনের দুর্নীতির চিত্র পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
আইনমন্ত্রী বলেন, রুপসা ঘাটে পাঁচ-দশজন ব্যক্তি লাভবান হওয়ার জন্য পুরো দলের বদনাম সরকার মেনে নেবে না। প্রশাসনকে আইনগতভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
জামিন নিয়ে কোনো ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ নাকচ করে তিনি বলেন, বিচার বিভাগ স্বাধীন। সরকার বিচার বিভাগে হস্তক্ষেপ করে না। টেলিফোন করে কাউকে জামিন দেওয়া বা না দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। সরকারি কৌঁসুলিরা আইনগতভাবে জামিনের বিরোধিতা করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন।
তিনি সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, কোনো মামলায় সরকারি কৌঁসুলির কার্যালয় মৃদু আপত্তি জানালে বা আপত্তি না তুললে তথ্য দিয়ে সংবাদ প্রকাশ করতে হবে। আমাকে তথ্য দেবেন, নিউজ করবেন। বাকিটা ইতিহাস হবে, বাকিটা আমি দেখব। সেখানে আমরা কোনো কম্প্রোমাইজ করব না।
মাদক নিয়ন্ত্রণে ডোপ টেস্ট চালুর অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, শৈলকূপা ও ঝিনাইদহে এ পদ্ধতি কার্যকরভাবে কাজ করছে। মাদকাসক্ত বা মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার সন্দেহে আটক ব্যক্তির ঘটনাস্থলেই পরীক্ষা করা হচ্ছে। পজিটিভ হলে বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে সামারি ট্রায়ালের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি গত ১৭ বছরে রাষ্ট্রযন্ত্রে পচন ধরেছিল বলে মন্তব্য করেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত ও ৩০ হাজার মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন বলেও দাবি করেন তিনি। এসব ঘটনায় জড়িত অনেকেই এখনও চাকরিতে বহাল রয়েছেন উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রযন্ত্রের আবর্জনা পরিষ্কার করতে সরকারকে সময় দিতে হবে।
সরকারের ছয় মাসের কার্যক্রমের সমালোচনার জবাবে তিনি বলেন, পরিবর্তন ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হচ্ছে। মন্ত্রীদের জ্বালানি বরাদ্দ ৩০ শতাংশ কমানো এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকল কমানোর বিষয়ও তুলে ধরেন তিনি।
সভায় জাতীয় সংসদের হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুল এমপি, আজিজুল বারি হেলাল এমপি, আমির এজাজ খান এমপি, সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু, খুলনা ওয়াসার চেয়ারম্যান মো. মনিরুজ্জামান মনি, কেডিএ’র চেয়ারম্যান এস এম শফিকুল আলম মনা, জেলা পরিষদ প্রশাসক মনিরুল হাসান বাপ্পি, রেঞ্জ ডিআইজি মো. মোস্তাফিজুর রহমান, খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো. সাজ্জাদুর রহমান, জেলা পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক,
মহানগর জামায়াত আমির অধ্যাপক মাহফুজুর রহমান, খেলাফত মজলিসের মহানগর সভাপতি এফএম হারুনার রশিদ, ইসলামী আন্দোলনের শেখ মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন এনসপির সংগঠক আহমদ হামিম রাহাত, সাইফ নেওয়াজসহ প্রশাসন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও সাংবাদিক প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় অন্যান্য বক্তারা খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, মাদক, অস্ত্র ও চাঁদাবাজি, সাইবার ক্রাইম ও দখল বাজিসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরে জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন।



