বিরোধী কণ্ঠে বাধা

সরকারি দলের এমপি-মন্ত্রীদের সতর্ক স্পিকার-ডেপুটি স্পিকারের
প্রবাহ রিপোর্ট : চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত হয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ। ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ২১২টি আসনে জয়লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। এর ফলে বিএনপি সরকার গঠন করে এবং দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
সেই ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্যরা বিরোধী দলকে টিপ্পনী-কাটাকাটিসহ ইচ্ছামতো বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ চান। কিন্তু এ ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম ও ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। তারা সরকারি দলের সদস্যদেরও বিরোধী দলের মতো স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোরভাবে নিয়ম মেনে চলার চেষ্টা করছেন। এ নিয়ে সরকারি দলের সদস্যরা প্রতিবাদও করেছেন।
অন্যদিকে, বিরোধী দলের সদস্যরা যদি সরকারি দলের সদস্যদের বক্তব্যে বাধা দেন, তখনও স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার সংসদের কার্যক্রম সুশৃঙ্খল রাখার চেষ্টা করছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে বিরোধী ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের বক্তব্যের সুযোগ দেওয়া, সরকারি দলের সদস্যদের হইচই থামানো এবং সংসদীয় বিধি মেনে কার্যক্রম পরিচালনায় স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা চলছে।
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় তাদের দুজনের অবস্থানই স্পষ্ট হয়েছে। একদিকে সদস্যদের কথা বলার সুযোগ নিশ্চিত করতে ডেপুটি স্পিকারকে কড়া হতে দেখা গেছে, অন্যদিকে সংসদীয় কমিটি ও অধিবেশন কক্ষের শৃঙ্খলা নিয়ে স্পিকারও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন।
গত বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে ব্যাংক রেজ্যুলেশন (সংশোধন) বিলের ওপর বক্তব্য দিচ্ছিলেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। তিনি বিএনপি সরকারের সমালোচনা শুরু করলে সরকারি দলের সদস্যরা হইচই ও প্রতিবাদ করতে থাকেন। একপর্যায়ে সংসদে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পরও তাদের প্রতিবাদ চলতে থাকে।
এ সময় অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল। তিনি সরকারি দলের সদস্যদের শান্ত হতে বলেন। একজন সদস্য বক্তব্য দিচ্ছেন এবং তাঁর কথা বলার স্বাধীনতা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বক্তব্যের সঙ্গে কারও দ্বিমত থাকলে সংশ্লিষ্ট সদস্যের বক্তব্যের সময় তা খ-ন করা যেতে পারে।
ডেপুটি স্পিকার আরও বলেন, কোনো বক্তব্য অসংসদীয় হলে সভাপতির আসন থেকে তা এক্সপাঞ্জ করার বিধান রয়েছে। কিন্তু বক্তব্য দেওয়ার সুযোগই বন্ধ করে দেওয়া সংসদীয় রীতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।
এ সময় চিফ হুইপের দায়িত্বের কথাও স্মরণ করিয়ে দেন তিনি। সংসদে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সদস্যদের বক্তব্যের সুযোগ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকারি দলের হুইপদেরও দায়িত্ব রয়েছে বলে জানান ডেপুটি স্পিকার।
রুমিন ফারহানা ওই সময় বিরোধী দলের সদস্য ছিলেন না, ছিলেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য। ফলে তাঁর বক্তব্যে বাধা দেওয়ার ঘটনায় ডেপুটি স্পিকারের অবস্থান স্বতন্ত্র সদস্যদের বক্তব্যের অধিকার নিয়েও আলোচনা তৈরি করেছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিয়ে গত ৭ সেপ্টেম্বর সংসদে আলোচনার সময়ও ডেপুটি স্পিকারের বক্তব্য সামনে আসে। কার্যপ্রণালি বিধির ৬৮ বিধিতে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের দেওয়া নোটিশের ওপর ওই আলোচনা হয়।
আলোচনায় গ্যাস ও জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, দীর্ঘ লোডশেডিং, শিল্পকারখানার উৎপাদন কমে যাওয়া এবং বেকারত্ব বাড়ার বিষয় উঠে আসে। এতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বক্তব্য দেন।
আলোচনা শেষে ডেপুটি স্পিকার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বক্তব্যের ধরন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, জনসমক্ষে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিয়ে কথা বলার সময় প্রধানমন্ত্রী পরিস্থিতি স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করেন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বক্তব্যে একই ধরনের স্বীকারোক্তি বা পরিস্থিতি স্বীকার করার প্রবণতা দেখা যায় না।
জাতির সামনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র তুলে ধরার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
জাতীয় সংসদের অবসরপ্রাপ্ত পরিচালক কামরুল ইসলাম বলেন, সংসদের কার্যকারিতা শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের আইন পাসের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না। সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিরোধী দলের প্রশ্ন, সমালোচনা, বিকল্প প্রস্তাব এবং জনগণের অভিযোগ সংসদে কতটা জায়গা পাচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, কোনো সদস্যের বক্তব্য সরকারের পছন্দ না হলেও তাঁকে কথা বলার সুযোগ দিতে হবে। বক্তব্য অসংসদীয় হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
অন্যদিকে, স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের অবস্থানও সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কঠোর দেখা গেছে। সংসদ পরিচালনায় তিনি শৃঙ্খলার পাশাপাশি সংসদীয় বিধিবিধান মানার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।
অধিবেশন কক্ষে মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের মোবাইল ফোন ব্যবহার, সাইড টক এবং প্রশ্নোত্তর ও নোটিশপর্বে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর অনুপস্থিতি নিয়ে তিনি আপত্তি জানিয়েছেন।
সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠনের ক্ষেত্রেও বিধি মানার ওপর জোর দিয়েছেন স্পিকার। মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদার ব্যক্তিদের স্থায়ী কমিটির সভাপতি করার বিষয়ে তিনি উষ্মা প্রকাশ করেছেন। এ বিষয়ে চিফ হুইপকে নির্দেশনাও দিয়েছেন।
নির্বাহী বিভাগের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা সংসদীয় কমিটির নেতৃত্বে থাকলে সরকারের ওপর সেই কমিটির নজরদারি কতটা কার্যকর হবে, সে প্রশ্নও তুলেছেন স্পিকার।
সংসদে মন্ত্রীদের বক্তব্যের ধরন নিয়েও স্পিকারের আপত্তি দেখা গেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদসহ কয়েকজন মন্ত্রীর বিদ্রুপপূর্ণ বা কটাক্ষমূলক বক্তব্যের বিরোধিতা করেছেন তিনি।
বিরোধী দলের সমালোচনার জবাব দেওয়া মন্ত্রীদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। তবে সেই জবাব তথ্য ও যুক্তির ভিত্তিতে হওয়া উচিত বলে মনে করেন স্পিকার। বিদ্রুপ বা কটাক্ষের মাধ্যমে জবাব দেওয়া হলে সংসদীয় বিতর্কের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলেও তিনি সতর্ক করেছেন।
জাতীয় সংসদের এক কর্মকর্তা বলেন, তৃতীয় অধিবেশনে কয়েকটি ঘটনায় সংসদ পরিচালনায় স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অবস্থান নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। সদস্যদের কথা বলার সুযোগ, সংসদীয় শৃঙ্খলা, কমিটি গঠন এবং মন্ত্রীদের বক্তব্য—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই সভাপতির আসন থেকে নির্দেশনা ও সতর্কবার্তা এসেছে।
এখন এসব নির্দেশনা ও রুলিং ভবিষ্যতে কীভাবে প্রয়োগ করা হয়, সেটিই দেখার বিষয়। সংসদে সরকারি দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতার পাশাপাশি বিরোধী ও স্বতন্ত্র সদস্যদের বক্তব্যের সুযোগ এবং সরকারের জবাবদিহির জায়গা কতটা নিশ্চিত হয়, তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করবে সংসদীয় কার্যক্রমের পরিবেশ।



