জাতীয় সংবাদ

হামের টিকা বন্ধ নয়, কভারেজ ধসে বেড়েছে ঝুঁকি

# মন্ত্রীর বক্তব্যে বিভ্রান্তি #

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ ঢাকার শিশু হাসপাতালের করিডোরে ৮ মাস বয়সী শিশুকে কোলে নিয়ে বসেছিলেন রাবেয়া হোসেন। জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া, শেষে শরীরজুড়ে ফুসকুড়ি। স্থানীয় চিকিৎসক প্রথমে ‘ভাইরাল জ্বর’ বললেও ঢাকায় এসে জানা গেল, সেটি হাম। অথচ শিশুটির এখনো টিকা নেওয়ার বয়সই হয়নি। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি ১১ মাস বয়সী এক শিশুর বাবা বলছিলেন, ‘তিন দিন জ্বর ছিল, পরে শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। আমরা বুঝতেই পারিনি এত দ্রুত খারাপ হয়ে যাবে।’ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে তার সন্তানের মতো আরও অনেক শিশুকে অক্সিজেন সাপোর্টে দেখা গেছে। রাজশাহীর এক মা বলছিলেন, ‘ডাক্তার বলেছেন, আমার ছেলে দ্বিতীয় ডোজটা পায়নি। এখন হাম হয়ে নিউমোনিয়াও হয়েছে।’ চাঁপাইনবাবগঞ্জে আরেক পরিবার তাদের প্রথম সন্তান, ৮ মাসের শিশুকে হারিয়েছে জ্বর, ফুসকুড়ি আর শ্বাসকষ্টের কয়েক দিনের মধ্যেই। এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হাম আক্রান্ত শিশুদের চাপ বাড়ছে। বিভিন্ন হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর এখন পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে অন্তত ৪১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে সবচেয়ে বেশি, ২১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ৬, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে ৫, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৪, চাঁদপুরে ৩ এবং রাজশাহী ও পাবনায় একজন করে শিশু মারা গেছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, আট বছর ধরে হামের টিকা দেওয়া হয়নি। পরদিন আবার বলেন, ২০১৮ সালের পর আর কোনো ক্যাম্পেইন হয়নি। কিন্তু সরকারি তথ্য, ইপিআই পরিসংখ্যান ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের বক্তব্য বলছে ভিন্ন চিত্র। টিকাদান কখনো বন্ধ হয়নি, বরং সাম্প্রতিক সময়ে কভারেজে বড় ধসই হাম বাড়ার প্রধান কারণ। ফলে প্রশ্ন উঠছে, মন্ত্রীর বক্তব্য আর বাস্তবতার মধ্যে অমিল কোথায়?
সরকারি তথ্য বলছে: টিকাদান বন্ধ ছিল না ঃ সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১২ মাস বয়সী শিশুদের হামসহ নিয়মিত টিকাদানের কভারেজ ছিল মোটামুটি উচ্চমাত্রায়। সরকারি প্রশাসনিক হিসাব অনুযায়ী, ২০১৮ সালে টিকাদানের হার ছিল ৮৯ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০২২ সালে তা উঠে যায় ১০৩ দশমিক ৬ শতাংশে। ২০২৪ সালে নেমে আসে ৮৬ দশমিক ৬ শতাংশে। আর ২০২৫ সালে বড় ধস নেমে তা দাঁড়ায় ৫৯ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ টিকাদান কর্মসূচি বন্ধ ছিল না। বরং অন্তত ২০২৩ সাল পর্যন্ত কভারেজ তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী ছিল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ইপিআই-এর উপপরিচালক ডা. মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদও বলেছেন, ‘প্রতিবছরই বাংলাদেশে হামের টিকা দেওয়া হয়েছে, কোনো বছরই বাদ যায়নি।’ এই বক্তব্য মন্ত্রীর ‘আট বছর টিকা দেওয়া হয়নি’ মন্তব্যের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। মন্ত্রী কি টিকা নয়, ক্যাম্পেইনের কথা বলেছেন? এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে, ইপিআই টিকাদান এবং বড় আকারের জাতীয় ক্যাম্পেইন এক জিনিস নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, মন্ত্রী হয়তো বিশেষ জাতীয় ক্যাম্পেইন বোঝাতে চেয়েছেন। কিন্তু সেটিকেও ‘টিকা দেওয়া হয়নি’ হিসেবে বলা তথ্যগতভাবে বিভ্রান্তিকর। কারণ, ২০২০ সালের ১২ থেকে ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশজুড়ে হাম–রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন হয়েছে। অর্থাৎ, যদি জাতীয় ক্যাম্পেইনের কথাও ধরা হয়, তবু ‘২০১৮ সালের পর আর হয়নি’ বক্তব্যও পুরোপুরি সঠিক নয়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ভাষা এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ। ‘টিকা বন্ধ’ আর ‘কভারেজ কমে যাওয়া’ এই দুইয়ের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য আছে। প্রথমটি সম্পূর্ণ বন্ধের ধারণা দেয়, দ্বিতীয়টি দুর্বল বাস্তবায়ন বা ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button