জাতীয় সংবাদ

ইরানের নিখুঁত নিশানা এখন মধ্যপ্রাচ্যের বড় বিপদ

রয়টার্সের বিশেষ প্রতিবেদন
ইরানের মাইনের আঘাতে হরমুজে ২টি জাহাজডুবি

প্রবাহ ডেস্ক : যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান এবং তাদের মদতপুষ্ট গোষ্ঠীগুলো পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে অবকাঠামোর ওপর বহু সুনির্দিষ্ট হামলা চালিয়েছে। তারা পরিকল্পিতভাবে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি অকেজো করে দিয়েছে, যার ফলে পুরো অঞ্চলজুড়ে একের পর এক বিপর্যয় ঘটেছে এবং অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অত্যন্ত নিপুণভাবে পরিচালিত এই অভিযানের মাধ্যমেই বোঝা যায়, কীভাবে শক্তিশালী মার্কিন সামরিক বাহিনীর মোকাবিলায় ইরান নিজেদের অবস্থান টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে। বৃহস্পতিবার এক বিশেষ প্রতিবেদনে রয়টার্স এ তথ্য জানিয়েছে।
ইরান এবং তাদের অস্ত্র সহায়তা পাওয়া মিত্ররা সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দরে তেল পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থাকে লক্ষ্যবস্তু করেছিল। এর ফলে সেখানে কয়েক সপ্তাহ ধরে কার্যক্রম বন্ধ ছিল। তারা কাতারের রাস লাফান তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) স্থাপনায় হামলা চালিয়ে দুটি ‘কোল্ড বক্স’ (গ্যাসকে তরল করার শীতলীকরণ যন্ত্রের আধার) ক্ষতিগ্রস্ত করে। এছাড়া তারা অন্তত চারটি দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দরে হামলা চালিয়েছে; যার মধ্যে চলতি মাসেই সৌদি আরবের একটি বিমানবন্দরে এক সপ্তাহের ব্যবধানে চারবার হামলা চালানো হয়েছে। পাশাপাশি, সৌদি আরবের একটি প্রধান পাইপলাইনের পাম্পিং স্টেশন তারা পুড়িয়ে দিয়েছে এবং আরও দুটি স্টেশন ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এর ফলে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের দেওয়া অবরোধ এড়িয়ে তেল পরিবহনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথও বন্ধ হয়ে গেছে।
এই যুদ্ধের সময় উপসাগরীয় অঞ্চলের অবকাঠামোর ওপর হওয়া এ ধরনের হামলার কথা বিভিন্ন আঞ্চলিক সরকার ও অন্যান্য পক্ষগুলো জানিয়েছে, তবে বিস্তারিত কোনো তথ্য দেয়নি। কিন্তু রয়টার্সের এক অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে যে, এসব হামলা কতটা নিখুঁত ছিল, এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে কী ধরনের যান্ত্রিক বিপর্যয় ঘটেছে এবং কী পরিমাণ ভৌত ও অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
ইরান উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর—সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক, কাতার, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইন—অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন ইরানের বিরুদ্ধে বোমা হামলা শুরু করে, তখন থেকে এখন পর্যন্ত ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্তত ৮৪টি অবকাঠামোয় ১৩৫টিরও বেশি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।
এই হামলাগুলো পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে, তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে এবং কয়েক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চাপের মুখে থাকা ইরানকে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধের পাশাপাশি, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার এই সক্ষমতা উপসাগরীয় আরব প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য একটি দীর্ঘস্থায়ী হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি বিশ্ব অর্থনীতির ওপর ইরানকে ব্যাপক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ করে দিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি আলোচনার ক্ষেত্রে তাদের দর কষাকষির ক্ষমতা বাড়িয়ে দিয়েছে।
কিছু লক্ষ্যবস্তু ছাদ বা আচ্ছাদনের নিচে এমনভাবে লুকানো ছিল যে, মহাকাশ থেকে সেগুলো দেখা সম্ভব নয়। আবার কিছু লক্ষ্যবস্তু মাত্র কয়েক মিটার জায়গাজুড়ে বিস্তৃত। অনেক স্থাপনার উদ্দেশ্য এমন যে, তেল শোধন, পারমাণবিক প্রযুক্তি বা ধাতু গলানোর মতো বিশেষ কারিগরি জ্ঞান না থাকলে সেগুলো দেখে বোঝার উপায় নেই।
সরাসরি ঘটনাস্থলে না যাওয়ায়, উপসাগরীয় দেশগুলোর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কতটা সফল ছিল বা ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ মাত্রা কত—তা সবসময় নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব হয়নি। তবে রয়টার্স বারবার দেখেছে, ইরানের হামলাগুলো ছিল অত্যন্ত নিখুঁত এবং যেসব সরঞ্জামে আঘাত করা হয়েছে, সেগুলো ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্রের মেরিন কোরের বিশেষ অভিযানের সাবেক এয়ারস্ট্রাইক কোঅর্ডিনেটর রায়ান স্টিভেন্স বলেছেন, ইরানের এই হামলাগুলোতে ‘নিখুঁত লক্ষ্যভেদ, লক্ষ্যবস্তু নির্বাচনের দক্ষতা এবং ধৈর্যের’ পরিচয় পাওয়া যায়।
ইরানি তেলের ওপর অবরোধ আরোপকারী যুক্তরাষ্ট্র বারবারই ইরানের ধ্বংসক্ষমতাকে খাটো করে দেখানোর চেষ্টা করে। আরব উপসাগরীয় দেশগুলোও প্রায়শই তাদের অবকাঠামোর বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির কথা স্বীকার করতে চায় না; বরং তারা দাবি করে যে, ইরানের ছোড়া অস্ত্রগুলো সফলভাবে প্রতিহত করার সময় আকাশ থেকে পড়ে যাওয়া ধ্বংসাবশেষের কারণেই তাদের স্থাপনাগুলোর ক্ষতি হয়েছে।
সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র ও মার্কিন নৌবাহিনীর ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স বলেন, “আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে ইরান যে হুমকি সৃষ্টি করেছে, সে বিষয়ে ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড অত্যন্ত স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে।”
জেনেভায় জাতিসংঘের দপ্তরে অবস্থিত ইরানের মিশন—যারা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেওয়ার দায়িত্বে রয়েছে—তাদের কাছে বিস্তারিত মন্তব্য জানতে চাওয়া হলেও তারা কোনো সাড়া দেয়নি।
ইরানের সুপরিকল্পিত অবকাঠামোগত হামলার সাফল্য এটিই প্রমাণ করে যে, কীভাবে এই ইসলামি প্রজাতন্ত্রটি বছরের পর বছর ধরে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাত সত্ত্বেও টিকে রয়েছে। রয়টার্সের আগের প্রতিবেদনগুলোতে উঠে এসেছিল যে, ইরান কীভাবে ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ ও অবৈধ জুয়ার নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে অনৈতিক উপায়ে অর্থ উপার্জন করছে এবং নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলছে; কীভাবে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করেছে; এবং কীভাবে এই যুদ্ধ দমন-পীড়নের এক নতুন যুগের সূচনা করেছে।
কিছু এলাকা প্রায় প্রতিদিন বোমা হামলার শিকার হয়েছে; সেখানে ক্ষয়ক্ষতি মেরামত এবং রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে কয়েক বিলিয়ন ডলারে। আবার আবুধাবিতে অবস্থিত বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম অ্যালুমিনিয়াম গলানোর কারখানার (অ্যালুমিনিয়াম স্মেল্টার) মতো কিছু স্থাপনা মাত্র একদিনের হামলায় ধ্বংস হয়ে গেছে। এসব হামলার কিছু চালিয়েছে ইয়েমেনে ইরান সমর্থিত হুথি গোষ্ঠী এবং তেহরানের নিয়ন্ত্রিত ইরাকি শিয়া মিলিশিয়ারা।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ফুজাইরাহ বন্দর। হরমুজ প্রণালির ঠিক দক্ষিণে অবস্থিত হওয়ায় এই বন্দরটি সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ইরানের অবরোধ এড়িয়ে চলার সুযোগ করে দিয়েছিল। কয়েক দশকের মধ্যে তেল সরবরাহে সৃষ্ট সবচেয়ে বড় সংকটকালে এই বন্দরটি বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য যেন এক ‘জীবন রক্ষাকারী তরী’ হিসেবে কাজ করেছে।
রয়টার্সের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান থেকে আসা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ফুজাইরাহ বন্দরে অন্তত ১৯ বার আঘাত হেনেছে, যা বন্দরটির গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমকে অচল করে দিয়েছে।
মার্চের মাঝামাঝি সময়ে ফুজাইরাহ বন্দরে হামলার একটি ঢেউ কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করা এক বিদেশি ব্যবসায়ী বলেন, “আমরা ড্রোনগুলোকে এগিয়ে আসতে দেখলাম এবং হেলিকপ্টার দিয়ে সেগুলোকে আকাশেই ধ্বংস হতে দেখলাম। তারা ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রোন পাঠাচ্ছিল, যার মধ্যে এক বা দুটি ড্রোন প্রতিরক্ষা ব্যূহ ভেদ করে ভেতরে ঢুকে পড়েছিল।”
রয়টার্স অবকাঠামোর ওপর এসব হামলার বিষয়ে ৩৬ জনের সাক্ষাৎকার নিয়েছে, হামলার ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করেছে এবং ক্ষয়ক্ষতির প্রমাণ ও হামলার সময় নির্ধারণের জন্য সরকারি বিবৃতিসহ রাডার, অপটিক্যাল ও আবহাওয়া উপগ্রহ থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করেছে। প্রতিবেদনটি প্রকাশের আগে রয়টার্সের সাংবাদিকরা তাদের প্রাপ্ত ফলাফলগুলো সংশ্লিষ্ট স্থাপনা পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ এবং ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর সরকারের কাছে উপস্থাপন করেছিলেন।
তেল ও গ্যাস রপ্তানি একটি সুসংহত ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয়—যার মধ্যে রয়েছে খনিজ উত্তোলনের কূপ, শত শত কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত পাইপলাইন, প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য শোধনাগার এবং এমন সব বন্দর, যেখান থেকে জাহাজগুলো বিশ্ববাজারের উদ্দেশ্যে পণ্য বোঝাই করতে পারে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের বৃহত্তম পেট্রো-রাষ্ট্র সৌদি আরবের ক্ষেত্রে, এই পুরো অবকাঠামোটি আক্রমণের জন্য অসংখ্য লক্ষ্যবস্তু তৈরি করে—এটি এমন এক দুর্বলতা, যা কয়েক দশক ধরে বারবার চিহ্নিত করা হয়েছে। এমনকি ১৯৮৩ সালের সিআইএ -এর প্রতিবেদনেও এর উল্লেখ ছিল। দেশটি বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ১০ শতাংশ উৎপাদনের পাশাপাশি প্রাকৃতিক গ্যাস ও পেট্রোকেমিক্যাল পণ্যও উৎপাদন করে থাকে।
সৌদি আরবের প্রায় সমস্ত তেল রপ্তানি দুটি প্রধান বন্দরের মাধ্যমে হয়ে থাকে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশটি সাধারণত পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের ‘রাস তানুরা’ বন্দরের মাধ্যমে পাঠানো হয়। তবে সৌদি আরব লোহিত সাগরের উপকূলে অবস্থিত বিশাল ‘কিং ফাহাদ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পোর্ট’ (ইয়াম্বু বন্দর) থেকেও তেল রপ্তানি করতে পারে।
যুদ্ধ শুরুর পর, হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে সৌদি তেল রপ্তানির জন্য ইয়াম্বু বন্দর এবং এর সঙ্গে যুক্ত পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পথ হয়ে ওঠে। লোহিত সাগরের এই বন্দর থেকে ছেড়ে আসা অধিকাংশ জাহাজকে ইয়েমেনে হুথি-নিয়ন্ত্রিত এলাকা এবং সংকীর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালির মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
এই কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত শিল্প খাতের দুটি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ ও এপ্রিল মাসে ইরান সীমান্ত থেকে ১ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দূরে অবস্থিত ইয়াম্বু বন্দরে অন্তত দুবার ড্রোন হামলা চালানো হয়।
‘আইআইআর এনার্জি’-এর এনার্জি ইন্টেলিজেন্স বিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট হিলারি স্টিভেনসন জানান, ১৯ মার্চ ইরান সমর্থিত পক্ষগুলো সৌদি আরামকো মবিল রিফাইনারি লিমিটেড-এর ইয়াম্বু শোধনাগারে ড্রোন হামলা চালায়। এর ফলে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত শোধনাগারটির উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৭০ শতাংশে নেমে আসে। ওই সময়ের কাছাকাছি তোলা ইয়াম্বুর একটি স্যাটেলাইট ছবিতে পোড়া দাগ দেখা যায়, তবে শোধনাগারের ঠিক কোন জায়গায় আঘাত লেগেছিল, তা রয়টার্স নিশ্চিত হতে পারেনি।
১০ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের একটি পাম্পিং স্টেশনে আকাশপথে হামলা চালানো হয়, যার ফলে পাইপলাইনটি ১১ দিন বন্ধ ছিল। এ ঘটনার পর সৌদি আরবের কিছু তেলবাহী জাহাজ পুনরায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে পাঠানো শুরু হয়; কারণ লোহিত সাগরের তুলনায় হরমুজ প্রণালিকে অনেকেই তখন বেশি নিরাপদ বলে মনে করছিলেন।
এপ্রিলের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর লোহিত সাগরে হামলা কিছুটা কমে আসে।
তবে রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৩ জুলাই যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভেঙে যাওয়ার পর ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর-এর কমান্ডাররা ইয়েমেনে যান এবং হুথিদের জন্য ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সরঞ্জাম পৌঁছে দেন।
পরদিন ট্রাম্প ইরানের অবকাঠামোতে হামলার হুমকি দেন। রয়টার্সের ভিজ্যুয়াল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৬ থেকে ১৮ জুলাইয়ের মধ্যে মার্কিন বাহিনী ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দর আব্বাস-এর দিকে যাওয়ার প্রধান সড়কগুলোতে অন্তত তিনটি সেতু ও একটি সুড়ঙ্গে হামলা চালায়। উল্লেখ্য, হরমুজ প্রণালির কাছে অবস্থিত বন্দর আব্বাস হলো ইরানের নৌবাহিনীর সদর দপ্তর।
এর প্রতিশোধ হিসেবে হুথিরা সৌদি আরবে হামলা চালায়। লোহিত সাগরে সৌদি আরবের পেট্রোলিয়াম কার্যক্রমগুলো বড় ধরনের হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল। হুথিরা এসব হামলার দায় স্বীকার করেছে। তবে ইরান জানিয়েছে, হুথিদের কর্মকা-ের জন্য তারা দায়ী নয়। হামলার বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে হুথি মুখপাত্র কোনো সাড়া দেননি।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ইয়েমেন সীমান্ত থেকে ১০০ কিলোমিটারেরও কম দূরত্বে অবস্থিত জাজান শোধনাগারে ২৫ জুলাই থেকে ৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে অন্তত চারবার হামলা চালানো হয়। আইআইআর এনার্জি-এর স্টিভেনসন জানান, প্রথম হামলায় শোধনাগারের ট্যাংক ফার্ম এবং এর সংলগ্ন ‘ইন্টিগ্রেটেড গ্যাসিফিকেশন কম্বাইন্ড সাইকেল’ কমপ্লেক্স ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই কমপ্লেক্সটি তেলকে গ্যাসে রূপান্তরিত করে, যা শোধনাগার পরিচালনার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
স্টিভেনসন এবং আরামকোর কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত দুজন ব্যক্তির ভাষ্যমতে, এসব হামলার পর জাজান শোধনাগারে তেল প্রক্রিয়াজাতকরণের পরিমাণ শূন্যে নেমে আসে। কেপলার-এর তথ্য অনুযায়ী, ২৪ জুলাইয়ের পর থেকে এই শোধনাগারে মাত্র একটি জাহাজে তেল লোড করা হয়েছে।
রয়টার্সের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিভিন্ন হামলায় সৌদি আরবের নয়টি বৃহত্তম শোধনাগারের পাঁচটি এবং প্রধান তেল প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রগুলোর তিনটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে আরামকোর বর্ণনা অনুযায়ী বিশ্বের বৃহত্তম শোধনাগারটিও রয়েছে।
যুদ্ধের প্রথম ছয় মাসের বেশিরভাগ সময় সৌদি আরবে দৈনিক তেল উৎপাদনের পরিমাণ ৭০ লাখ ব্যারেলের নিচে নেমে এসেছিল, যেখানে যুদ্ধের আগে এই পরিমাণ ছিল ১ কোটি ব্যারেলেরও বেশি। বর্তমান বাজারমূল্য অনুযায়ী, এর ফলে ৫০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ক্ষতি হয়েছে।
এক্সনমোবিল ও শেল -এর মতো পশ্চিমা জ্বালানি কোম্পানিগুলো এখানে যৌথ উদ্যোগে কার্যক্রম পরিচালনা করে। এসব হামলার কারণে তাদের সম্মিলিতভাবে কয়েক কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছে। আরামকো, এক্সনমোবিল এবং শেল—কোনো কোম্পানিই মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। ৭ সেপ্টেম্বর ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার এসব হামলার উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ ‘এক্স’-এ দেওয়া এক পোস্টে লেখেন, “বিষয়টি সহজ: এখানকার তেল ও গ্যাস উৎপাদন ব্যবস্থা অত্যন্ত বিস্তৃত, সহজে পৌঁছানো যায় এমন এবং অরক্ষিত। এই জলসীমা ও স্থাপনাগুলোতে থাকা আমেরিকান তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলোও একইভাবে ঝুঁকির মুখে রয়েছে।”
ইরানের মাইনের আঘাতে হরমুজে জাহাজডুবি : হরমুজ প্রণালিতে ইরানের মাইনের আঘাতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের মালিকানাধীন ২টি কনটেইনারবাহী জাহাজ ডুবে গেছে। আর এই জাহাজডুবির পর প্রণালিটিতে দামি পারমিউম আর আইফোন ভাসতে দেখা গেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য সান জানিয়েছে, এরপর থেকে অনেক ছোট নৌকা ওই জাহাজের কাছে গিয়ে সেগুলো কুড়িয়ে নিয়ে আবার বিক্রি করে দিচ্ছে সামাজিকমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা গেছে, দামি পারফিউমের বোতল ও প্যাকেটসহ আইফোনগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে।
জিএফ প্রাইড নামে ওই জাহাজটি গতকাল বুধবার ডুবে যায়। এর আগে এটি একটি মাইনের সঙ্গে ধাক্কা খায়। এ ঘটনার পর পর জাহাজে থাকা ২১ জন ক্রুকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। এতে জাহাজের ক্রুদের কেউ হতাহত না হলেও এটি ডুবে যায়। আর জাহাজটিতে আড়াই হাজার কনটেইনার ছিল। ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড জানিয়েছে, কার্গো জাহাজটি অননুমোদিত রুট দিয়ে চলছিল। তখন এটি মাইনের সঙ্গে ধাক্কা খায়। তবে নৌ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জাহাজটিতে অজ্ঞাত বস্তু দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। ফলে কী কারণে বিশাল জাহাজটি ডুবে গেলো সেটি এখনো স্পষ্ট নয়।
এই জাহাজডুবির আগে বিপ্লবী গার্ড ঘোষণা দিয়েছিল, হরমুজে তারা নজরদারি বৃদ্ধি করবে। বাহিনীটি অভিযোগ করে, আমিরাতের সেনাবাহিনীর সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ দিয়ে তেল পাচার করছে।
এছাড়া হরমুজে অ্যান্টিগা অ্যান্ড বার্বুডার পতাকাবাহী একটি জাহাজও ডুবে গেছে। গত ২৩ সেপ্টেম্বর এটি হামলার শিকার হয়। ওই ঘটনায় এক ক্রু নিহত হন। আর বাকিদের উদ্ধার করা হয়। সূত্র: দ্য সান

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন
Close
Back to top button