সম্পাদকীয়

মন্দ ঋণ বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ জরুরি

ব্যাংকিং খাতে অরাজকতা

দেশে ব্যাংকিং খাতে অনেক দিন ধরেই এক ধরনের অরাজকতা চলছে। রাজনৈতিক চাপ, আর্থিক অনিয়ম বা অন্যান্য কারণে এমন সব ঋণ দেওয়া হয়েছে, যে অর্থ আর ব্যাংকে ফেরত আসছে না। ফলে কেবলই বেড়েছে খেলাপি ঋণ এবং একটি নির্দিষ্ট সময় পর খেলাপি ঋণের একটি বড় অংশ মন্দ ঋণে পরিণত হয়েছে। প্রকাশিত খবরে জানা যায়, চলতি বছরের জুন মাসের শেষে ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় দুই লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা মোট ঋণের ১২.৫৬ শতাংশ। বিশাল অঙ্কের এই খেলাপির মধ্যে মন্দ ঋণের পরিমাণই দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৬৭ হাজার ৮৮৯ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় ১০ শতাংশ। অথচ ২০২৩ সালের ডিসেম্বরেও মন্দ ঋণের পরিমাণ ছিল এক লাখ ২৬ হাজার ৭৮২ কোটি টাকা, যা ওই সময় বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৮ শতাংশ ছিল। সে হিসাবে ছয় মাসের ব্যবধানে মন্দ ঋণ বেড়েছে ৪১ হাজার ১০৭ কোটি টাকা। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। মন্দ ঋণের পরিমাণ এভাবে বেড়ে যাওয়া ব্যাংকিং খাতের জন্য এক অশনিসংকেত। এই অর্থ ব্যাংকে ফেরত আসার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। মন্দ ঋণের কারণে ব্যাংকের লভ্যাংশ কমে যায়, শেয়ার মালিকরা বঞ্চিত হন। অনেক ব্যাংকও বিপদগ্রস্ত হয়। ব্যাংকে মন্দ ঋণ বৃদ্ধি পাওয়ার জন্য মূলত দায়ী যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই না করে ঋণ দেওয়া বা দুর্বল মূল্যায়ন প্রক্রিয়া, নিরাপত্তা বা জামানতের ঘাটতি, ঋণ পুনঃ তফসিল ও পুনর্গঠনে ছাড় দেওয়া ইত্যাদি। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সুশাসন বা তদারকির অভাবও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। ক্ষমতাসীনদের চাপে পড়েও অনেক সময় ব্যাংকগুলোকে ঋণ দিতে হয়েছে। আবার ব্যাংকের অনেক প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের অনৈতিক যোগসাজশেও এসব ঋণ দেওয়া হয়েছে। এসব ঋণ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক থেকে যেমন গেছে, তেমনি গেছে বেসরকারি মালিকানাধীন ব্যাংক থেকেও। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন মাস শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে মন্দ ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। এ ছাড়া বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে এই পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮২ হাজার ৩৮১ কোটি টাকা। এ ছাড়া বিদেশি ব্যাংকগুলোতে দুই হাজার ৯৩৪ কোটি ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোতে চার হাজার ৭২১ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে মন্দ ঋণ। ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মন্দ ঋণের বেশির ভাগই পাচার হয়ে গেছে। অন্তর্বর্তী সরকার বিদেশে পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা অত্যন্ত সময়োপযোগী। আমরা আশা করি, ব্যাংকের মন্দ ঋণ ও অনিয়মের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। একই সঙ্গে মন্দ ঋণের পরিমাণ নিকট ভবিষ্যতে আর যাতে না বাড়ে সে জন্য এখন থেকেই যথেষ্ট সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন
Close
Back to top button