প্রবল বর্ষণে রাঙামাটির সঙ্গে চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ির যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ একটানা প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে কাপ্তাই হ্রদ এবং কর্ণফুলী নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় রাঙামাটির সঙ্গে চট্টগ্রাম এবং খাগড়াছড়ি জেলার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এছাড়াও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে রাঙামাটির বরকল, বাঘাইছড়ি, লংগদু, জুরাছড়ি, বিলাইছড়ি, রাজস্থলী উপজেলার নিম্নাঞ্চলগুলো কাপ্তাই হ্রদের পানিতে তলিয়ে গেছে। বর্তমান ওইসব এলাকাগুলোর সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। মাইনী নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় রাঙামাটির লংগদু উপজেলার সঙ্গে খাগড়াছড়ি জেলার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এছাড়াও বাঘাইছড়ি উপজেলার মাচালং এলাকা মাইনী নদীর পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় সাজেকের সঙ্গে খাগড়াছড়ির যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। সেখানে আটকা পড়েছে প্রায় ৬০০ পর্যটক। পাহাড় ধসের ঘটনায় ওই উপজেলার পশ্চিম লাইল্যাঘোনা এলাকায় মঙ্গলবার সকালে লক্ষ্মী বিলাশ চাকমা (৬০) নামে এক বৃদ্ধ মারা গেছেন। এছাড়াও উপজেলাটির বিভিন্ন সড়কে পাহাড়ধসে পড়ার সংবাদ পাওয়া গেছে। খাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপজেলার কেংড়াছড়ি এবং মহালছড়ি কলেজে সড়কে পানি ওঠায় রাঙামাটির সঙ্গে খাগড়াছড়ির সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এদিকে প্রবল বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলায় সড়কে পানি ওঠায় রাত ৮টার দিকে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত রাঙামাটির সঙ্গে চট্টগ্রামের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। রাঙামাটি জেলা সদরের বেশকিছু সড়কে পাহাড় ধসে পড়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে সড়ক বিভাগ এবং ফায়ার সার্ভিস সড়ক থেকে মাটি সরিয়ে নেওয়ায় সড়ক যোগাযোগ সচল আছে। জেলার কাপ্তাই উপজেলায়ও বেশ কিছু সড়কে পাহাড়ধসে পড়েছে। স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন ফায়ার সার্ভিসের সহায়তায় মাটি সরিয়ে নেওয়ায় ওই উপজেলায় সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে ওই উপজেলার চন্দ্রঘোনা ইউনিয়নে মঙ্গলবার সকালে পাহাড় ধসে পড়ে দুই শিশু আহত হয়। এদিকে রাঙামাটি জেলা শহরে পাহাড়ধস থেকে বাঁচতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে সরে যেতে জেলা প্রশাসন সচেতনতামূলক মাইকিং এবং প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় রাঙামাটি পৌর এলাকার ৯টি ওয়ার্ডে ১১টিসহ পুরো জেলায় ২১২টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রেখেছে। জানমালের ক্ষতি এড়াতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসরতদের দ্রুত সময়ে আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে। বর্তমানে আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে শতাধিক মানুষ আশ্রয় নিয়েছে বলে জানানো হয়। সাজেক কটেজ মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক রাহুল চাকমা জন জানান, সাজেকে প্রবল বর্ষণের কারণে ৬০০ পর্যটক আটকা পড়েছে। সাজেকের মাচালং সড়কে পানি ওঠায় যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। যদি বিকেলের মধ্যে সড়ক থেকে পানি সরে যায় তবে আটকাপড়া পর্যটকদের খাগড়াছড়ি সদরে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে। রিসোর্ট মালিক সমিতির এ নেতা জানান, আপাতত আটকাপড়া পর্যটকদের কাছ থেকে রুম ভাড়া নেওয়া হচ্ছে না। এর আগে ৭ জুলাই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে অনির্দিষ্টকালের জন্য সাজেকের সব পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে পর্যটকদের নিরাপত্তার স্বার্থে সাজেক ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন। রাঙামাটি চট্টগ্রাম মোটর মালিক সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম শাকিল বলেন, চট্টগ্রামের বিভিন্ন সড়কে পানি ওঠায় রাঙামাটির সঙ্গে চট্টগ্রামের সড়ক যোগাযোগ আপাতত বন্ধ রয়েছে। তবে সড়ক থেকে পানি গেলে আবারও যোগাযোগ সচল হবে বলে জানান তিনি। এদিকে প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে কাপ্তাই নদে পানি বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সবকটি ইউনিট পুনরায় সচল রয়েছে। বর্তমানে পাঁচটি থেকে ১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে বলে জানান কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান। এ প্রকৌশলী বলেন, বর্তমানে হ্রদে পানি রয়েছে ৮১ দশমিক ৩১ফুট মিনস সি লেভেল। রুল কার্ভ অনুযায়ী এ সময়ে হ্রদে পানি থাকার কথা ৮৫ দশমিক ১২ ফুট মিনস সি লেভেল। তবে এইভাবে বর্ষণ অব্যাহত থাকলে পাঁচটি ইউনিট থেকে ২৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে জানান তিনি। উল্লেখ্য, কর্ণফুলী পানি কেন্দ্রটি ২৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন এবং হ্রদের পানি ধারণক্ষমতা ১০৮ ফুট মিনস সি লেভেল। রাঙামাটির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. তারেক সেকান্দার জানান, জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে পুলিশ বাহিনী মাঠে কাজ করছে। যারা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আছেন, তাদের নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা চালানো হচ্ছে। রাঙামাটির অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মুহাম্মদ ইমরানুল হক ভুঁইয়া বলেন, অনেক জায়গায় ভারী বর্ষণের কারণে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটছে। আমরা কোনো প্রাণহানি চাই না। তাই যারা এখনো ঝুঁকি নিয়ে এলাকায় আছেন, তারা দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রে চলে আসুন। তিনি আরও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, প্রাণ বাঁচাতে সর্বশেষ চেষ্টা হিসেবে প্রয়োজনে বলপ্রয়োগ করে বাসিন্দাদের আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হবে।
