লুটপাট লুকাতে জালিয়াতি

# ব্যাংক খাতের অবক্ষয়ের এক বিস্ময়কর চিত্র #
এনআরবিসি ব্যাংকের মূল সার্ভার থেকে ১১ লাখ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও রেকর্ড মুছে ফেলার ঘটনাটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এটিকে সাধারণ কোনো অনিয়ম বা কারিগরি ত্রুটি হিসাবে দেখার সুযোগ নেই; এটি একটি পরিকল্পিত ঘটনা, যা প্রাতিষ্ঠানিক দস্যুতার শামিল। অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ এ প্রসঙ্গে বলেছেন, দেশের ব্যাংক খাতে যা হয়েছে, তা পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন। আমরা মনে করি, দেশের আর্থিক খাতের আমানতকারীদের নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় নজরদারি ব্যবস্থাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এমন ধৃষ্টতা যারা দেখিয়েছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত। গতকাল দেশের বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ জালিয়াতির মাধ্যমে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র, হাজার কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতি এবং শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার তথ্য আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে। এসব ঘটনা ঘটেছে ২০১৩ থেকে ২০২৫ সালের মে মাসের মধ্যে। অর্থাৎ ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পট পরিবর্তনের পরও ব্যাংকটিতে অনিয়ম অব্যাহত আছে। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নিযুক্ত ফরেনসিক অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী, এ জালিয়াতির সঙ্গে ব্যাংকটির একজন সাবেক চেয়ারম্যান, নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ অনেকের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। দেশের ব্যাংক খাতে অনিয়ম-দুর্নীতি-লুটপাটের তথ্য নতুন নয়। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশের অর্থনীতির যেসব খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, সেগুলোর মধ্যে শীর্ষে ছিল ব্যাংক খাত। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কিছু ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করলে অনেকেই স্বস্তিবোধ করেছিলেন। তারা মনে করেছিলেন, ব্যাংক খাতে আর কোনো বড় ধরনের অনিয়ম ঘটবে না। কিন্তু ৫ আগস্টের পরও যে এ খাতে ভয়াবহ অনিয়ম অব্যাহত আছে, উল্লিখিত ঘটনা তার প্রমাণ। কাজেই ব্যাংক খাতের বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে দৃষ্টি দেওয়া উচিত। এ খাত বর্তমানে বড় ধরনের আস্থার সংকটে ভুগছে। আমানতকারীদের অর্থের সুরক্ষা দিতে না পারলে এ আস্থা পুনরুদ্ধার কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে। যে কোনো দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি তার ব্যাংকিং ব্যবস্থা, যা দাঁড়িয়ে থাকে জনমানুষের বিশ্বাসের ওপর। যখন কোনো ব্যাংক নিজেই নিজের নথিপত্র ধ্বংস করে ফেলে, তখন পুরো ব্যবস্থার ওপর থেকে মানুষের আস্থা ধসে পড়বে, এটাই স্বাভাবিক। আর্থিক খাতের অনেক বড় কেলেঙ্কারির সুষ্ঠু বিচার না হওয়ায় অপরাধীরা পার পেয়ে গেছে, যার পরিণতি বলা যায়, আজকের এই এনআরবিসি ব্যাংকের জালিয়াতি। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থাকে অনতিবিলম্বে ব্যাংকের মুছে ফেলা তথ্য উদ্ধার করার পাশাপাশি এ জঘন্য অপরাধের পেছনে থাকা মূল হোতা, সুবিধাভোগী এবং সহায়তাকারীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। লুটেরাদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে দেশের ব্যাংক খাতকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা কঠিন হবে। আমরা আশা করি, আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ও জন-আস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ এবং এই ভয়ংকর জালিয়াতির বিরুদ্ধে কঠোরতম আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে।
