স্থানীয় সংবাদ

খুলনায় ঠিকাদার ও ইঞ্জিনিয়ার মিলে খননের নামে চড়া নদীকে ড্রেন বানানোর অপচেষ্টা

# নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন, পিচের সড়ক হুমকির মুখে
# পানি শুকিয়ে ফেলায় তরমুজ চাষীদের মাথায় হাত
# ৮২ লাখের প্রকল্পের তথ্য নিয়ে লুকোচুরি
# দাকোপের কৈলাশগঞ্জের চড়া নদী

মুহাম্মদ নূরুজ্জামান, দাকোপ থেকে ফিরে :
সুন্দরবন সংলগ্ন দাকোপ উপজেলার কৈলাশগঞ্জের চড়া নদী খননের নামে ঠিকাদার ও এলজিইডি ইঞ্জিনিয়ার মিলে ড্রেন বানানোর ষড়যন্ত্র করছে। চার ফুট গভীরতার কথা থাকলেও সরজমিনে দুই ফুটের বেশি দেখা যায়নি। তড়িঘড়ি করে চলছে খনন কাজ, মানা হচ্ছে না কোন নিয়মের বালাই।
এদিকে, খাল বাঁচানোর নামে ইতিমধ্যে শত শত গাছ কেটে সাবাড় করেছে ঠিকাদার। খালের এক ধারের পিচের রাস্তার অর্ধেক, অপর পাড়ের ইট সোলিং রাস্তার পুরোটাই বন্ধ করে ফেলেছে মাটি তুলে। টেন্ডারে কি আছে, আর কাজ হবে কোন পন্থায়- জানেননা স্থানীয় কোন জনপ্রতিনিধি। তাড়াহুড়া করে কাজ শুরু করায় খাল শুকিয়ে ফেলা হয়েছে। ফলে পানির অভাবে তরমুজ চাষ করতে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন কৃষক। এ নিয়ে সর্বসাধারণের মাঝে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিলেও উপজেলা প্রকৌশলী আর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্টরা রয়েছেন সম্পূর্ণ নির্বিকার। ৮২ লাখ টাকার এ প্রকল্পের তথ্য নিয়েও করা হচ্ছে লুকোচুরি। প্রকল্প এলাকায় তথ্যসম্বলিত কোন সাইনবোর্ডও দেওয়া হয়নি।
শনিবার খুলনা মহানগর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরের সুন্দরবন ঘেঁষা উপজেলা দাকোপের কৈলাশগঞ্জ ইউনিয়নে গিয়ে চড়া নদী খনন নিয়ে ঠিকাদারের নয়ছয়ের নানা চিত্র দেখা যায়।
এলাকাবাসী জানান, এক সময় প্রমত্তা নদী ছিল চরা। সুন্দরবন থেকে শুরু হয়ে ১৩ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে বাজুয়ায় গিয়ে মিলেছিল এই নদী। পরে নদীতে বাঁধ হওয়ায় তা মরে খালে পরিণত হয়। আর এখন ঠিকাদার ও এলজিইডি ইঞ্জিনিয়ার মিলে খননের নামে একে ড্রেন বানানোর ষড়যন্ত্র করছে।
ইউনিয়নের ৫টি ওয়ার্ডের বাসিন্দারা সরাসরি এই খালের পানি ব্যবহার করেন। খাল সংলগ্ন ১ নং ওয়ার্ডের মেম্বার ফয়সাল আলম, ৩ নং ওয়ার্ডের অমিত মন্ডল, ৬ নং ওয়ার্ডের প্রবীর মন্ডল, ৭ নং ওয়ার্ডের তপন সরকার, ৮ নং ওয়ার্ডের সুখেন্দু রপ্তান, ৯ নং ওয়ার্ডের মেম্বার স্বপন মন্ডল অভিযোগ করেন, ঈদের আগে হঠাৎ একদিন ভেকু মেশিন এনে কাজ শুরু করেন ঠিকাদার। হরিণটানা ঘোলের খাল পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতি লিঃ কাজটি পেয়েছে। কিভাবে, কোন প্রক্রিয়ায় উপজেলা প্রকৌশলী তাদেরকে কাজ দিলেন, কতো টাকার কাজ, কতো দিনে সম্পন্ন হবে, কিভাবে কাজ হবে সে সম্পর্কে আমরা কেউই অবগত না। ভেকু মেশিনে খালের মাটি কেটে কোথায় পাড়ে আবার কোথায় খালের ভেতরেই ফেলে রাখা হয়েছে। পাহাড় সমান মাটির স্তুপের নিচে ঢাকা পড়েছে কৈলাশগঞ্জ পশ্চিম পাড়া পিচের রাস্তার প্রায় অর্ধেক, আর ১ নং ওয়ার্ড দশ ঘরের ইট সোলিং রাস্তা পুরোটাই। খালের তলদেশ চার ফুট করে খনন করার কথা থাকলেও এক থেকে দেড় ফুটের বেশি খোড়া হচ্ছেনা কোথাও। সবচেয়ে বড় অভিযোগ, খালের পাড়ের অন্তত তিন শতাধিক নানা প্রজাতির গাছ ইতিমধ্যে কেটে বা ভেকু মেশিন দিয়ে উপড়ে ফেলা হয়েছে। কিছু গাছ মাটি চাপা পড়ে মৃতপ্রায়।
বাজুয়া এস এন ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক প্রলয় মজুমদার অভিযোগ করেন, আগে খালের দুই পাড় সবুজে ছাওয়া ছিল। এখন মরুভূমি হয়ে গেছে। তিনশ’র বেশি গাছ মারা পড়েছে। যার মধ্যে গেওয়া, শিরিস, বাবলা, সজনে, নিম, বরই, কলা, পেপে আছে। গাছের ক্ষতি করতে নিষেধ করা হলেও তারা কারো কথা কানে তুলছে না।
রামনগর গ্রামের কৃষক রামমোহন মন্ডল অভিযোগ করেন, তরমুজের জন্য বিখ্যাত এই অঞ্চলের সব কৃষক চাষের জন্য খালের পানি ব্যবহার করতাম। হঠাৎ একদিন আমাদের বলা হলো, যার যার পানি লাগবে নিয়ে নাও। আমরা খাল শুকায়ে মাটি কাটবো। এরপর ডিপের পানি কিনে চাষ করতে গিয়ে খরচ বেড়ে গেল।
অপর দিকে কৈলাশগঞ্জ ৬নং ওয়ার্ডের তরমুজ চাষী সমীরন মল্লিক বলেন, তরমুজ এর ভরা মৌসুমে অনেক পানি প্রয়োজন হয়, ঠিক এই সময়ে খালের পানি শুকিয়ে কৃষির অপূরনীয় ক্ষতি করছে, তেমনি খাল খননের নামে টাকা খরচ করে খাল ভরাটের মহাউৎসবে মেতে উঠেছে।
হরিণটানা ঘোলের খাল পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতি লিমিটেডের সাধারণ সম্পাদক শংকর পাইক দাবি করেন, তরমুজ চাষীদের স্বার্থে পানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে খাল খনন প্রকল্প নিয়েছে এলজিইডি। এর আগে আরও তিনটি খাল খননের অভিজ্ঞতা থাকায় আমরা কাজ পেয়েছি। ৮২ লাখ টাকা বাজেটের এই কাজের মেয়াদ তিন মাস। আমাদের হাতে এখনও ২৬ দিন সময় আছে। খালের পাঁচ কিলোমিটার অংশ খনন করতে হবে। আবহাওয়া ভালো থাকলে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে পারবো। ভেকু মেশিনে ৭০ ভাগ কাজ হবে, ৩০ ভাগ কাজ হবে সমিতির সদস্যদের মাধ্যমে। কাজ করতে গিয়ে কিছু গাছ কাটা পড়েছে বলে স্বীকার করেন তিনি। আর খালের মাটি ফেলার কারণে পিচের রাস্তা ও ইট সোলিং রাস্তা বন্ধ হয়ে গেলেও তারা দ্রুত সব মাটি সরিয়ে ফেলবেন।
জানতে চাইলে দাকোপ উপজেলা প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলমকে একাধিক বার ফোন দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি। এসএমএস দেওয়া হলেও রিপ্লাই দেননি।
অভিযোগ আছে, সমিতির সভাপতি তপন মন্ডল কৈলাশগঞ্জ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি। আর সাধারণ সম্পাদক শংকর পাইক ১ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। সমিতিতে ৩৬০ জন সদস্যের মধ্যে তাদের পরিবারেরই একগাদা সদস্য রয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে শংকর বলেন, এক সময় সবাই আওয়ামী লীগে ছিলাম ঠিকই। কিন্ত এখন কি আর আওয়ামী লীগ আছে? পাল্টা প্রশ্ন রাখেন তিনি।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button