জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত: দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সুপেয় পানির তীব্র সংকট, বিপন্ন জনস্বাস্থ্য ও কৃষি

এম মোসলেম উদ্দিন আহম্মেদ, পাইকগাছা : জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর ও ভয়াবহ প্রভাব ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় উপকূলীয় জনজীবনে। খুলনার উপকূলীয় উপজেলা কয়রা ও পাইকগাছাসহ সাতক্ষীরা এবং বাগেরহাটের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে সুপেয় পানির সংকট এখন চরম আকার ধারণ করেছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলোচ্ছ্বাস, অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাঁধ কেটে লোনা পানি ঢোকানো এবং ভূগর্ভস্থ পানির অতিব্যবহারের ফলে এ অঞ্চলের মিঠা পানির উৎসগুলো ক্রমান্বয়ে সংকুচিত হয়ে আসছে। ফলশ্রুতিতে কৃষি, পরিবেশ ও স্থানীয় জীবিকার পাশাপাশি মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে পুরো উপকূলীয় অঞ্চলের জনস্বাস্থ্য। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মানবসৃষ্ট কারণে প্রকট সংকট স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবিদদের মতে, প্রকৃতির প্রতিকূলতার পাশাপাশি মানবসৃষ্ট নানা কর্মকা-ের কারণে এই সংকট দিন দিন আরও তীব্র হচ্ছে। ওয়াপদা বাঁধ কেটে, ছিদ্র করে কিংবা পাইপ ও স্লুইসগেট বসিয়ে অনিয়ন্ত্রিতভাবে চিংড়ি ঘেরের জন্য লোনা পানি প্রবাহের ফলে নদী-খাল, পুকুর এমনকি ভূগর্ভস্থ পানিও অতিরিক্ত লবণাক্ত হয়ে পড়ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কেবল খাবার পানিই নয়Íগৃহস্থালির দৈনন্দিন কাজ এবং গবাদিপশুর জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপদ পানি সংগ্রহ করাও এখন অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে এই পানির হাহাকার রূপ নেয় তীব্র সংকটময় পরিস্থিতিতে। নারী ও শিশুদের ওপর দুর্ভোগের মাত্রাতিরিক্ত চাপ উপকূলের অধিকাংশ পরিবারকে এখন পানির জন্য দূর-দূরান্তের সচল টিউবওয়েল, সংরক্ষিত পুকুর কিংবা বৃষ্টির ধরে রাখা পানির ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে হচ্ছে। সুপেয় পানি সংগ্রহের মূল দায়িত্বটি সাধারণত নারীদের কাঁধে থাকায়, প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার পথ হেঁটে পানি আনতে গিয়ে তাঁদের প্রচুর সময় নষ্ট হচ্ছে এবং তীব্র শারীরিক কষ্টের শিকার হতে হচ্ছে। একই সাথে দূরবর্তী নির্জন এলাকায় যাতায়াতের সময় নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা ঝুঁকিও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলেছে। দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি ও বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত লবণাক্ত ও দূষিত পানি পান এবং ব্যবহারের ফলে এ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে চর্মরোগ, শ্বাসকষ্ট ও ফুসফুসের সমস্যাসহ মূত্রাশয় ও কিডনির নানা জটিলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিক দূষণ পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। এ বিষয়ে পাইকগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক আহসানারা বিনতে আহমেদ জানান, “দীর্ঘদিন ধরে অনিরাপদ ও দূষিত পানি পান করা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। শারীরিক জটিলতা এড়াতে প্রতিটি নলকূপ পরীক্ষা করে আর্সেনিক ও লোনা পানির উপস্থিতি শনাক্ত করা এবং দ্রুততম সময়ে নিরাপদ পানির সরবরাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।” প্রাক্তন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. প্রভাত কুমার বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সৃষ্ট পানির উচ্চ লবণাক্ততা উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। ক্যানসারের মতো জটিল রোগব্যাধির নির্দিষ্ট কারণ নির্ণয়ে যেমন গভীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও গবেষণা প্রয়োজন, তেমনি এখন থেকেই সুপেয় পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা ও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো আবশ্যক।” কৃষি ও পরিবেশের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব। ফসলি জমিতে লোনা পানির অবাধ অনুপ্রবেশের ফলে মাটির উর্বরতা শক্তি দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। এতে ধান, শাকসবজি ও ফলদ ফসলের ফলন আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ায় কৃষিনির্ভর পরিবারগুলো চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে। কৃষির এই বিপর্যয়ের পাশাপাশি স্থানীয় জীববৈচিত্র্য ও বনাঞ্চলও মারাত্মক অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। স্থায়ী সমাধান ও সুশীল সমাজের সুনির্দিষ্ট দাবি। উপকূলের স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও পরিবেশ কর্মীদের পক্ষ থেকে সংকট নিরসনে দ্রুত কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে। বাঁধ ও গেট ব্যবস্থাপনা বেড়িবাঁধ কেটে অনিয়ন্ত্রিত লোনা পানি প্রবেশ রোধে ওয়াপদা বাঁধ ও স্লুইসগেট ব্যবস্থাপনা কঠোর ও শক্তিশালী করা। উৎসবিন্দু চিহ্নিতকরণ: এলাকার সকল টিউবওয়েল পরীক্ষা করে আর্সেনিক ও লবণাক্ত ঝুঁকিপূর্ণ উৎসগুলো অবিলম্বে লাল চিহ্নিত করা। বিকল্প পানির ব্যবস্থা: ব্যাপক হারে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা, পুকুর পুনর্খনন এবং পুকুরের পানি শোধনে পিএসএফ (পন্ড স্যান্ড ফিল্টার) ও রিভার্স অসমোসিস প্ল্যান্ট স্থাপন। কৃষি অভিযোজন: পরিবর্তনশীল আবহাওয়ার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততাসহিষ্ণু ফসলের চাষাবাদ বৃদ্ধি করা। নিয়মিত মান পর্যবেক্ষণ: স্থানীয় জলাশয় ও সুপেয় পানির উৎসের গুণগত মান নিয়মিত পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা। বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, এখনই সমন্বিত, কার্যকর ও স্থায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে এই সুপেয় পানির সংকট অদূর ভবিষ্যতে উপকূলীয় অঞ্চলে এক বিশাল মানবিক ও স্বাস্থ্য বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।



