আলী খামেনির জানাজায় তেহরানে ইরানিদের ঢল

# ‘আমরা আলী খামেনির রক্তের প্রতিশোধ নেব’, লাখো ইরানির প্রতিজ্ঞা #
প্রবাহ রিপোর্ট ঃ গত ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন-ইসরাইলি বিমান হামলায় নিহত ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজায় অংশ নিতে রাজধানী তেহরানে সমবেত হয়েছেন লাখ লাখ মানুষ। শনিবার (৪ জুন) থেকে শুরু হওয়া প্রায় সপ্তাহব্যাপী এই শোকানুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের প্রতি নিজেদের কঠোর প্রতিরোধ ও চ্যালেঞ্জের বার্তা দিতে চাইছে দেশটির প্রশাসন। শিয়া ঐতিহ্যের প্রতিশোধ ও ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবে কালো পোশাক পরিধান করে এবং ‘রক্ত-লাল’ পতাকা হাতে নিয়ে অনুগত জনতা তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা ধর্মীয় প্রাঙ্গণে এসে ভিড় জমান। ১৯৮৯ সাল থেকে দীর্ঘ সাড়ে তিন দশক ধরে ইরান শাসন করা খামেনি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের প্রথম দিনে সপরিবারে ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক ইসরাইলি বিমান হামলায় ৮৬ বছর বয়সে নিহত হন। দীর্ঘ শাসনামলে তিনি একদিকে যেমন পশ্চিমাদের সাথে তীব্র সংঘাতের নীতি বজায় রেখেছিলেন, তেমনি দেশের অভ্যন্তরে যেকোনো ভিন্নমত কঠোরভাবে দমন করেছিলেন। তীব্র গরম এবং প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার মধ্যে মোসাল্লা প্রাঙ্গণে সমবেত হাজার হাজার নারী ও পুরুষকে শীতল রাখতে কৃত্রিমভাবে পানি ছিটানো হচ্ছে। কঠোর লিঙ্গ-বিভাজন মেনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে শোকাতুর জনতা বুক চাপড়ে তাদের প্রিয় নেতার প্রতি গভীর শোক প্রকাশ করছেন। মূল মঞ্চের সামনে খামেনির কফিন রাখা হয়েছে, যার ওপর ঐতিহ্যবাহী কালো পাগড়ি শোভা পাচ্ছে। একই সাথে রাখা হয়েছে হামলায় নিহত তার আরও চার পারিবারিক সদস্যের কফিন, যার মধ্যে তার মাত্র ১৪ মাস বয়সি নাতনি জাহরা মোহাম্মদী গোলপায়গানির ছোট কফিনটি বিশেষভাবে সবার দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। সমাবেশ থেকে সমবেত জনতা মুহুর্মুহু ‘আমেরিকা ধ্বংস হোক’ এবং ‘প্রতিশোধ, প্রতিশোধ’ স্লোগান দিয়ে চারপাশ প্রকম্পিত করে তুলছেন। শোকানুষ্ঠানের এই বিশাল আয়োজনকে বর্তমান সরকারের প্রতি জনগণের সমর্থনের একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে গত জানুয়ারিতে দেশজুড়ে ঘটে যাওয়া গণবিক্ষোভ এবং তা দমনে কঠোর ব্যবস্থার পর, এই জমায়েতকে সরকার পরিচালনার বৈধতা প্রমাণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। পাঁচ সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি চললেও দুই পক্ষই যেকোনো মুহূর্তে পুনরায় যুদ্ধ শুরুর হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে। তবে মূল অনুষ্ঠান শুরুর আগে তেহরানের চিরচেনা যানজটপূর্ণ রাস্তাগুলো ছিল অনেকটাই ফাঁকা, এবং অনেক সাধারণ বাসিন্দা এই দীর্ঘ শোক চলাকালীন বিশৃঙ্খলা এড়াতে সাময়িকভাবে শহর ছেড়ে চলে গেছেন বলে জানা গেছে। এদিকে খামেনির উত্তরসূরি হিসেবে মনোনীত তার ছেলে মোজতবা খামেনিকে এখনও প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। ওই একই বিমান হামলায় তিনি গুরুতর আহত হয়েছিলেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। তবে শুক্রবার (৩ জুন) দেশটির শীর্ষ নেতারা বিদেশি প্রতিনিধিদের স্বাগত জানান এবং নিজেদের মধ্যে ইস্পাতকঠিন একতা প্রদর্শন করেন। শান্তিকালীন আলোচনায় অংশ নেওয়া পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং নবনিযুক্ত রেভল্যুশনারি গার্ডসের প্রধান আহমদ ওয়াহিদি জনগণকে দলে দলে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ইরানের এই প্রতিশোধের কণ্ঠস্বর যেন গোটা বিশ্বের কানে পৌঁছায়। কর্তৃপক্ষের ধারণা, কেবল রাজধানী তেহরানেই এক কোটিরও বেশি মানুষের সমাগম ঘটবে। ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির জানাজার পর এটিই ইরানের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় গণজমায়েত হতে যাচ্ছে। কোনো ধরনের পদদলন বা দুর্ঘটনা এড়াতে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে এবং রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সচেতনতামূলক নির্দেশনা প্রচার করা হচ্ছে। সূচি অনুযায়ী, তেহরানে তিন দিন কফিন রাখার পর মঙ্গলবার তা ধর্মীয় নগরী কোমে, বুধবার প্রতিবেশী দেশ ইরাকে এবং সবশেষে আগামী বৃহস্পতিবার খামেনির নিজ শহর মাশহাদে সমাহিত করা হবে। জানাজায় অংশ নেওয়া সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা ধর্মপ্রাণ মানুষ খামেনির মৃত্যুকে পারিবারিক অভিভাবক হারানোর চেয়েও বড় ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখছেন। একই সঙ্গে তারা এই হামলার জন্য দায়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত প্রতিশোধ নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করছেন। গ্র্যান্ড মোসাল্লা প্রাঙ্গণে জড়ো হওয়া জনতার আবেগ এবং ক্ষোভের চিত্র তুলে ধরে আরশ রাহিমি নামের ৪০ বছর বয়সি এক ব্যক্তি সংবাদসংস্থা রয়টার্সকে বলেন, আমরা নিশ্চিতভাবেই আমাদের নেতার রক্তের প্রতিশোধ নেব। আজ এখানে যারা সমবেত হয়েছেন, তারা প্রত্যেকেই সর্বোচ্চ নেতার হত্যার বিচার চান। আমাদের নেতা নিজেই সবসময় বলে গেছেন যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের রক্তের শত্রুতা রয়েছে। তাই আমেরিকার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কখনই ভালো হওয়ার নয়। এই জাতীয় শোকের গভীরতা সাধারণ ইরানিদের কতটা স্পর্শ করেছে, তার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষের কথায়। ইরানের হামাদান প্রদেশ থেকে তেহরানে আসা হামিদ তেইমোরি নামের এক শোকাহত ব্যক্তি নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, আমি এক অদ্ভুত ও অবর্ণনীয় মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আমার নিজের বাবা যখন মারা গিয়েছিলেন, তখনও আমি এতটা কাঁদিনি, যতটা কেঁদেছি আমাদের সর্বোচ্চ নেতার শাহাদাতের খবর শুনে। বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘ সাড়ে তিন দশক ধরে শাসন করা খামেনির এই জানাজাকে ইরান সরকার দেশের জনগণের আবেগ ও ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে এক অভূতপূর্ব জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে প্রদর্শন করতে চাইছে। একই সঙ্গে, মার্কিন-ইসরাইলি বিমান হামলায় সর্বোচ্চ নেতার এই আকস্মিক বিদায়কে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি এবং ওয়াশিংটন-তেহরান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও চরম সংঘাতের দিকে মোড় নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সূত্র: সিএনএন।


