সম্পাদকীয়

নীতিগত সহায়তা বাড়াতে হবে

# আর্থিক সংকটে শিল্প খাত #

দেশের অর্থনীতির রীতিমতো বিপর্যস্ত অবস্থা। বিনিয়োগে এক ধরনের স্থবিরতা নেমে এসেছে। বহু কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। নানা ধরনের সংকটে থাকা আরো অনেক কারখানা বন্ধ না হলেও ধুঁকে ধুঁকে চলছে, বন্ধ হয়ে যেতে পারে যেকোনো সময়। এর প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থানের ওপর। বেকারত্ব ক্রমে আকাশছোঁয়া হচ্ছে। জরুরি অনেক পণ্যের উৎপাদন কমে যাচ্ছে। বাজারের সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হচ্ছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে সরকার নানামুখী পদক্ষেপ নিচ্ছে। একই ধারাবাহিকতায় কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত সোমবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, দেশের বৃহৎ শিল্প ও ব্যাবসায়িক গ্রুপগুলোর উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম সচল রাখতে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিল্পগোষ্ঠীগুলো সাময়িক আর্থিক সংকটে পড়লেও তাদের কার্যক্রম যাতে ব্যাহত না হয় এবং বাজারে পণ্য ও সেবার সরবরাহ স্বাভাবিক থাকে, সে লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হবে। তিনি বলেন, দেশের বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান, ব্যাংকিং খাতের বড় অঙ্কের ঋণ ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম জড়িত। ফলে কোনো প্রতিষ্ঠান সাময়িক সংকটে পড়লে সেটির প্রভাব যাতে পুরো অর্থনীতিতে না পড়ে, সে বিষয়টি বিবেচনায় রেখে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রয়োজনীয় সহায়তা দিচ্ছে। স্বাধীনতার পর পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে অত্যন্ত কঠিন ও কঠোর পথ পাড়ি দিয়ে দেশের শিল্পায়ন ও ব্যাবসায়িক কার্যক্রম আজকের এ অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার কর্মসংস্থান হয়েছে। জনসংখ্যার চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন এগিয়েছে। বাজারে ভারসাম্য রক্ষিত হয়েছে। কিন্তু করোনা মহামারি, যুদ্ধের ধাক্কা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, জ্বালানি সংকট, ডলার সংকট, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহারসহ নানাবিধ সংকট মোকাবেলা করতে করতে দেশের দীর্ঘ সেই অগ্রযাত্রা মুখ থুবড়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে। আর একবার বড় ধরনের পতন হয়ে গেলে সেখান থেকে উঠে দাঁড়ানো অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়বে। উদ্যোক্তা ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক অস্থিরতার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ অনেক প্রতিকূলতা রয়েছে, যেগুলো মোকাবেলা করে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো লাভজনকভাবে চালানো যাচ্ছে না। উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এসব চাপের কারণে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, যা ব্যাবসায়িক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। উচ্চ সুদহার, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ-পরবর্তী জ্বালানি সংকট ও গ্যাস সংকটে ৩০ শতাংশের বেশি কমেছে উৎপাদন। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বাজার চাহিদা কমে যাওয়ায় বিক্রিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও আইসিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ মনে করেন, উচ্চ সুদের হার, উৎপাদন ও চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে দেশের বেসরকারি খাতে ব্যবসা-বাণিজ্য বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। অনেক কম্পানি লোকসানে পড়েছে, আবার অনেককে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নামতে হয়েছে। যেসব কম্পানি এখনো প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পেরেছে তাদেরও মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এই অবস্থাকে একটি দেশের অর্থনৈতিক ধারাবাহিকতার জন্য একটি অশনিসংকেত হিসেবেই দেখতে হবে। দেশের অর্থনৈতিক কর্মকা-ের গতি যাতে নিম্নমুখী না হয়, কর্মসংস্থান যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং বাজারের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ যাতে অব্যাহত থাকে, যেকোনো মূল্যে তা নিশ্চিত করতে হবে। আমরা মনে করি, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী। এ ধরনের নীতিগত সহায়তা আরো বাড়াতে হবে।

 

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button