সালথায় জামু ফকির হত্যা: গ্রেপ্তারে ধীরগতি, স্বজনদের উদ্বেগ-অভিযোগ

মাদারীপুর প্রতিনিধি ঃ ফরিদপুরের সালথা উপজেলার যদুনন্দী ইউনিয়নের কুমারকান্দা গ্রামে নৃশংসভাবে পান্নু ফকির ওরফে জামু ফকির (৪২) হত্যার দীর্ঘদিন পার হলেও এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে মূল আসামিরা। এদিকে প্রিয়জনকে (জামু ফকির) হারিয়ে সুবিচারের আশায় বুক বাঁধছে নিহতের পরিবার, অন্যদিকে এই বিষাদ ও সুযোগ নিয়ে এলাকায় চলছে এক শ্রেণির স্বার্থান্বেষী মহলের রামরাজত্ব। মামলা-হামলার ভয় দেখিয়ে নিরপরাধ মানুষ ও প্রবাসীদের পরিবার থেকে চাঁদা আদায়, প্রতিপক্ষের ক্ষেতের পাট কাটতে বাধা এবং বাজারে দোকানে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার মতো বেপরোয়া কর্মকা-ের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে। নৃশংস এই হত্যাকা-ের নেপথ্যের কারণ, তদন্তের বর্তমান অবস্থা, নিহতের স্বজনদের আকুতি এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিস্তারিত তুলে ধরা হলো। যেভাবে ঘটেছিল নৃশংসতা ঃ ২০২৬ সালের ২৪ জুন রাতে কুমারকান্দা গ্রামের রহমান ফকিরের ছেলে পান্নু ফকির ওরফে জামু ফকির স্থানীয় একটি জমিজমা সংক্রান্ত সালিশ বৈঠকে অংশ নেন। দীর্ঘদিন ধরেই গ্রামের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মালিকানা এবং স্থানীয় মসজিদের একটি ঘটনা নিয়ে জামু ফকিরের সঙ্গে প্রতিপক্ষের বিরোধ চলছিল। সালিশ বৈঠক শেষে রাতে একা বাড়ি ফেরার পথে পূর্বপরিকল্পিতভাবে তার ওপর হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ নিশ্চিত হয়, রাস্তার পাশের একটি পাটক্ষেতে নিয়ে জামু ফকিরকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তার শরীরে ৪০টিরও বেশি কোপের চিহ্ন পাওয়া যায়। খুনিরা তার হাত-পা কেটে শরীর ক্ষতবিক্ষত করে দেয় এবং ঘটনা আড়াল ও অন্য খাতে প্রবাহিত করার জন্য লাশটি কুমারকান্দার প্রধান সড়কের ওপর ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। পরদিন ২৫ জুন সকাল ৯টার দিকে স্থানীয় পথচারীরা রক্তাক্ত অবস্থায় লাশ দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দিলে সালথা থানা পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে লাশ উদ্ধার করে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। পাঁচদিনের সন্তান কোলে রেখে জামু ফকির খুন ঃ হত্যাকা-ের পর যদুনন্দী ইউনিয়নের কুমারকান্দা গ্রামে নিহতের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় শোকের মাতম। কোলে দেড় মাসের শিশুসন্তানকে জড়িয়ে ধরে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বিচার চাইছিলেন নিহতের স্ত্রী রুমা বেগম (রুপা)। তিনি কান্না সামলে বলেন, আমার কোলজুড়ে তখন মাত্র পাঁচ দিনের বাচ্চা। সেই সময় আমার স্বামীকে এভাবে পশুপাখির মতো কুপিয়ে হত্যা করা হলো। তার শরীরে ৪০টিরও বেশি কোপের দাগ ছিল। ঘটনা ঘটার পর প্রশাসন আমাদের দ্রুত আসামিদের গ্রেপ্তারের আশ্বাস দিয়েছিল। কিন্তু আজ দীর্ঘদিন পার হয়ে গেলেও অদৃশ্য কারণে মূল আসামিরা অধরা। আসামিরা অনেক টাকা-পয়সার মালিক এবং অত্যন্ত প্রভাবশালী। তাই আমরা বিচার পাওয়া নিয়ে চরম সংশয় ও আতঙ্কে ভুগছি। নিহতের স্বজনরা জানান, হত্যার আগেও জামু ফকিরের ওপর একাধিকবার অত্যাচার চালানো হয়েছিল। নিহতের চাচাতো ভাই মিজান ফকির বলেন, জামুকে হত্যার কিছুদিন আগে তার বসতঘরে আগুন দেওয়া হয়েছিল। এমনকি তার নিজ জমির মেহগনি গাছ পর্যন্ত কাটতে দেওয়া হয়নি। এরপরই পরিকল্পিতভাবে তাকে খুন করা হলো। মামলার এজাহারভুক্ত আসামিদের পুলিশ কেন ধরছে না, আমরা বুঝতে পারছি না। আরেক চাচাতো ভাই ওবায়দুর ফকির ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের এলাকায় সাধারণত খুনের ঘটনা ঘটলে প্রতিপক্ষের বাড়িতে লুটপাট করা হয়। কিন্তু আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে কারও বাড়িতে সামান্য ক্ষতিও করিনি। অথচ পুলিশ আমাদের বলে আসামিদের খুঁজে বের করে দিতে! আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মুখ থেকে এমন কথা শোনা অত্যন্ত দুঃখজনক। লাশের রাজনীতি-চাঁদাবাজি অভিযোগ ঃ জামু ফকির হত্যার পর থেকে যদুনন্দী এলাকায় এক ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় অধিবাসী ও আসামিপক্ষের পরিবারের অভিযোগ, এ হত্যাকা-কে হাতিয়ার বানিয়ে এলাকার একাংশ প্রভাবশালী নেতা সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে ব্যবসা শুরু করেছেন। বিশেষ করে যদুনন্দী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মনিরুজ্জামান হুমায়ুন খাঁ, সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম এবং সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী কাইয়ুম মোল্যার বিরুদ্ধে একাধিক বিস্ফোরক অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগীরা। প্রধান প্রধান অভিযোগুলো ঃ মামলার ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজি: হত্যা মামলায় নাম জড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে নির্দোষ গ্রামবাসী এবং প্রবাসী পরিবারগুলোর কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। যারা টাকা দিচ্ছেন, কেবল তারাই এলাকায় থাকতে পারছেন। পাট কাটতে বাধা: প্রতিপক্ষ ও সাধারণ কৃষকদের ক্ষেতের পাট কাটতে দেওয়া হচ্ছে না। তবে মোটা অঙ্কের চাঁদা পরিশোধ করলে পাট কাটার সুযোগ মিলছে। দোকানে ডাবল তালা: বাজারের একাধিক মুদির দোকানে জোরপূর্বক জোড়া তালা ঝুলিয়ে ব্যবসা বাণিজ্য বন্ধ করে রাখা হয়েছে। প্রবাসীদের ব্ল্যাকমেইল: ইউনিয়নটির প্রবাসীদের পরিবারকে টার্গেট করে অর্থ হাতানোর সরাসরি অভিযোগ এসেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক গ্রামবাসী জানান, ওই তিন নেতার রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের কারণে এসব নেতাদের বিরুদ্ধে কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পাচ্ছেন না। অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত ও বাদীপক্ষের বক্তব্য ঃ এসব গুরুতর অভিযোগের জবাবে নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে বাদী ও নিহতের ছেলে রুমান ফকির এবং স্ত্রী রুমা বেগম বিষয়গুলো আংশিক স্বীকার করলেও তা নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে করা হয়েছে বলে দাবি করেন। দোকানে তালা দেওয়ার বিষয়ে রুমান ফকির বলেন, আমরা দোকানে জোড়া তালা লাগিয়েছি যাতে প্রতিপক্ষের লোকজন নিজেরাই মালামাল সরিয়ে নিয়ে উল্টো আমাদের নামে মিথ্যা চুরির অপবাদ দিতে না পারে। আর পাট কাটতে বাধা দেওয়ার বিষয়ে তারা বলেন, ‘তারা নিজেরা পাট কাটলে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু অন্য এলাকা থেকে লোক ভাড়া করে এনে পাট কাটাচ্ছে। এতে তারা নিজেরা ঝামেলা করে আমাদের ওপর দোষ চাপাতে পারে, তাই বাধা দেওয়া হয়েছে।’ তবে কোনো প্রকার চাঁদাবাজির সঙ্গে তারা যুক্ত নন বলে স্পষ্ট দাবি করেন। অন্যদিকে, অভিযুক্ত নেতারা তাদের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও ষড়যন্ত্রমূলক বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। অভিযোগের ব্যাপারে যদুনন্দী ইউনিয়নের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী কাইয়ুম মোল্যা বলেন, আমি আগামী ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব। তাই আমার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমার বিরুদ্ধে এসব মিথ্যা অভিযোগ ছড়াচ্ছে। আমি বরং এলাকা শান্ত রাখার চেষ্টা করছি। এদিকে অভিযোগের ব্যাপারে যদুনন্দী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মনিরুজ্জামান হুমায়ুন খাঁ বলেন, জামু আমাদের দলের একজন নিষ্ঠাবান কর্মী ছিলেন। তাকে খুন করার পরও আমরা এলাকা শান্ত রেখেছি। এই গ্রামে কোনো লুটপাট বা সহিংসতা হতে দিইনি। যেখানে মার্ডার হয়, সেখানে আসামিদের ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়; কিন্তু আমরা একটি সুতাও নাড়াতে দিইনি। আমার বিরুদ্ধে করা সব অভিযোগ মিথ্যা।



