জাতীয় সংবাদ

গণহত্যাকারী হাসিনাকে প্রাসঙ্গিক করতে মরিয়া হিন্দুস্তানি মিডিয়া

প্রবাহ রিপোর্ট : ২৪’এর নজিরবিহীন গণঅভ্যুত্থানে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হওয়া আওয়ামী লীগ ফের প্রাসঙ্গিকতা ফিরে পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। ১৬ বছরের টানা দুঃশাসনে ১৮ কোটি মানুষের জীবনকে বিষিয়ে তোলায় যখন দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কোনো ইস্যুতেই স্থান পাচ্ছে না গণহত্যাকারী হাসিনা, তখন তাকে আলোচনায় ওঠাতে নতুন ছকে এগোচ্ছে দিল্লি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারত যতই চেষ্টা করুক- গণহত্যা, গুমখুন, দুর্নীতি ও লুটপাটের বিচার ও শাস্তি ছাড়া প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠার কোনো সুযোগই নেই সবাইকে মেরে ক্ষমতায় ফিরতে চাওয়া হাসিনার।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগের কোনো ভূমিকা ছাড়াই সংস্কার, জুলাই সনদের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ শেষে জাতীয় নির্বাচনের পথে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ। এই পরিস্থিতিতে যেন ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের চেয়েও বেশি দুশ্চিন্তায় পড়েছে দিল্লি। তাই এই মুহূর্তে খুনি হাসিনাকে তুলে ধরতে নিজেদের সর্বশক্তি এবং রাষ্ট্রীয় সব মেশিনারিকে ব্যবহার করছে ভারত।
ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগকে ছাড়া বুন্ধ খুঁজে না পাওয়া ভারতের কঠোর সমালোচনা করেছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। তিনি বলেছেন, এটা আশ্চর্যজনক নয় যে, শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীরা হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে অস্থির আচরণ করছেন। যেন শ্রাবণ মাসের পথের কুকুরের মতো। চেষ্টা করছেন রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা ফিরে পাওয়ার। কিন্তু নতুন বাংলাদেশের মানুষ তাদের অবস্থান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে: কোনো গণহত্যাকারী আর রাজনীতি করার সুযোগ পাবেন না। এমন ব্যক্তিদের একমাত্র স্থান কারাগার বা আদালতের বিচারে নির্ধারিত হলে ফাঁসির মঞ্চ।
ভারতীয় এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গতকাল হিন্দুস্তান টাইমস হাসিনার একটি ইমেইল সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছে। যেখানে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ও দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতে দেখা গেছে দিল্লির এই সেবাদাসীকে। ভারতে পালিয়ে থাকা সাবেক এই স্বৈরাচার তার সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক, বর্তমান অন্তর্র্বতীকালীন সরকারের নীতি এবং তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ নিয়েও কথা বলেন। ‘নিরাপদ আশ্রয়’ দেওয়ায় ভারতের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন অনুতাপহীন এই খুনি।
চলতি সপ্তাহে ভারতের বিখ্যাত সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন দ্য উইক উৎখাত হয়ে ভারতে পলাতক হাসিনাকে নিয়ে একটি কাভার স্টোরি ছেপেছে। এই কাভার স্টোরিতে তার একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ, ফ্যাসিস্ট আমলের তথ্যমন্ত্রী মো. আরাফাত এবং পত্রিকাটির একজন সাংবাদিক নম্রতা বিজি আহুজার একটি বিশ্লেষণ মূলক প্রবন্ধ প্রকাশ করা হয়েছে। প্রবন্ধে রক্তপিপাসু হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশ বিস্ফোরণের অপেক্ষায় থাকা একটি বিস্ফোরক ভর্তি পাত্র।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্রিটেন রয়টার্স ও এএফপিকে দেয়া সাক্ষাৎকারের পর এই দীর্ঘ প্রবন্ধটি প্রমাণ করে, শেখ হাসিনা পূর্বের থেকে সরব ও তৎপর হয়েছেন। তার এই সরব ও তৎপরতার পেছনে ভারত সরকারের ভূমিকা থাকা খুবই স্বাভাবিক।
এর আগে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স, ইন্ডিপেনডেন্ট এবং এএফপি হাসিনার ইমেইল সাক্ষাৎ প্রকাশ করে। বিবিসির রিপোর্ট অনুযায়ী, অতি সম্প্রতি যে সাক্ষাৎকারগুলো হাসিনা দিয়েছেন; তার পেছনে ভারতের বিভিন্ন সূত্র সহযোগিতা করেছে। ভারত যে সিদ্ধান্তটা পৌঁছে গেছে সেটা হলো, আওয়ামী লীগের বিকল্প তাদের বন্ধু নেই, আর আওয়ামী লীগের মধ্যে শেখ হাসিনার বিকল্প নেই; এটা তারা একেবারে শতভাগ নিশ্চিত। তাই নিজেদের অনেক কথাই এখন হাসিনার মুখ দিয়ে বলাচ্ছে দিল্লি।
অভ্যুত্থানের মুখে জনরোষ থেকে বাঁচতে ভারতে পালিয়ে যাওয়া হাসিনার ওপর শুরুতে বেশ কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল দিল্লি। তার অনেকগুলোই ধীরে ধীরে শিথিল করা হচ্ছে। বাংলাদেশের মানুষের ক্ষোভকে তোয়াক্কা না করে ভারত এখন হাসিনাকে বেশি করে মুখ খুলতে দিচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক মিডিয়াকে সাক্ষাৎকার পর্যন্ত দিতে দিচ্ছে। আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনকে বানচাল করতে এটিকে ভারতের প্রকাশ্য তৎপরতা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
অন্যদিকে, হাসিনা বিতাড়িত হওয়ার এক বছরের বেশি সময় পরে এসেও জনধিকৃত দলটির বিকল্প খুঁজে না পাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নয়াদিল্লি নিজেদের স্বার্থে ব্যবহারের জন্য আওয়ামী লীগকে যেভাবে নির্লজ্জ সেবাদাস দলে পরিণত করতে পেরেছিল তা পৃথিবীর কোনো আধিপত্যবাদী দেশ পারেনি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দিয়ে গোলামি করার মতো দ্বিতীয় কোনো গোষ্ঠীকে সামনে আনতে ব্যর্থ হয়েছে আগ্রাসী রাষ্ট্র ভারত। তাই সোনার ডিম পাড়া হাসিনা যখন মুখ খোলারই সুযোগ পাচ্ছে না, তখন তা চরমভাবে দুশ্চিন্তায় ফেলেছে ভারতকে।
ভারতের সব ধরনের বিরোধিতা ও প্রতিবন্ধকতা সত্বেও সকল ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে ২৪’এর নতুন বাংলাদেশ। অন্যদিকে, সম্প্রতি দেশে পাকিস্তানের সামরিক জেনারেল বা সরকারি কর্মকর্তাদের ঘন ঘন সফরে চরম উদ্বিগ্ন সাউথ ব্লক। তাই হাসিনার এই সাক্ষাৎকারগুলোর মধ্য দিয়ে আক্রমণাত্মক বার্তা দিতে চায়ছে মোদি সরকার।
রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতায় ফিরতে সাবেক শেখ হাসিনা মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। শুক্রবার (৭ নভেম্বর) রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি বলেন, এটি ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে শেখ হাসিনা ও তার ঘনিষ্ঠ মহল লাখ লাখ ডলার ব্যয় করে এক বিস্তৃত জনসংযোগ (পিআর) প্রচারণা চালাচ্ছেন। যার উদ্দেশ্যে তার ভূমিকা পুনর্লিখন, বিশেষ করে তার শাসন জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানকালে শত শত তরুণকে কেমন নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল তা গোপন করা।
প্রেস সচিব জানান, শেখ হাসিনা একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং কিছু ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এমনকি তার সাক্ষাৎকার নিয়েছে। যার মাধ্যমে তারা একজন গণহত্যাকারীকে সক্রিয়ভাবে প্ল্যাটফর্ম দিয়েছে। তারা জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তরের জুলাই হত্যাযজ্ঞবিষয়ক কঠোর তদন্ত প্রতিবেদনটি পড়ার কষ্টটুকুও করেনি। শেখ হাসিনার উদ্দেশ্য পরিষ্কার। তিনি জানেন যে জুলাই হত্যাযজ্ঞে তার ভূমিকা নিয়ে আদালতের রায় আসন্ন এবং দোষী সাব্যস্ত হলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার প্রাসঙ্গিকতা চিরতরে শেষ হয়ে যাবে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button