জাতীয় সংবাদ

মানিকগঞ্জে শতবর্ষী রাস্তায় স্টিলের গেট : অবরুদ্ধ ১৫ পরিবার!

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ মানিকগঞ্জ সদর উপজেলায় শতবর্ষের চলাচলের রাস্তায় স্টিলের গেটে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে ১৫ পরিবার অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে মোকতার খান নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। জেলার সদর উপজেলার কাকজিনগরে দীর্ঘদিনের রাস্তা বন্ধ করে দেওয়ায় অবরুদ্ধ অর্ধশতাধিক মানুষ। তবে অভিযুক্তের দাবি জায়গাটি তার পৈতৃক সম্পত্তি। জানা যায়, মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার দিঘি ইউনিয়নের কাকজিনগর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ বসবাস করে আসছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের যাতায়াতের জন্য তোফাজ্জল হোসেন খান মৌখিকভাবে জমি দিয়ে পায়ে হাঁটার এই পথটির সূচনা করেছিলেন। শতবর্ষের বেশি সময় ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে স্কুল কলেজের শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, নারী, বয়োবৃদ্ধ ও রোগীসহ এলাকার সবাই মূল সড়কে যাতায়াতে এই পথটি ব্যবহার করে আসছিলেন। সম্প্রতি তোফাজ্জল হোসেন খানের ছেলে মোকতার খান পৈতৃক সম্পত্তির অজুহাত দেখিয়ে রাস্তাটি বন্ধ করে স্টিলের গেট নির্মাণ করেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিনের এই পথটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জরুরি প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হতে পারছেন না অবরুদ্ধ বাসিন্দারা। বিষয়টি স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) জানানো হলে তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন তবে এখনো এর কোনো দৃশ্যমান সুরাহা হয়নি। কাকজিনগর এলাকার সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধ আব্দুল রহমান বলেন, আমি ছোটবেলা থেকেই দুই বাড়ির মাঝ দিয়ে এই পায়ে হাঁটার রাস্তা দেখে আসছি। তোফাজ্জল হোসেন খান দীর্ঘদিন গ্রামবাসীকে রাস্তাটি ব্যবহার করতে দিয়েছিলেন, কিন্তু তার সন্তানরা হঠাৎ করে সেটি বন্ধ করে দিয়েছেন। রাস্তাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভেতরের প্রায় ১৫টি পরিবারের অর্ধশতাধিক মানুষ এখন ঝোপঝাড়ের মধ্য দিয়ে কষ্ট করে চলাচল করছেন। অপর স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুর রহিম বলেন, রাস্তাটি বন্ধ করে দেওয়া হবে বলে তারা দীর্ঘদিন ধরে হুমকি দিয়ে আসছিলেন। বিষয়টি নিয়ে এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে একাধিকবার সালিশ বৈঠক হলেও তারা কোনো তোয়াক্কা না করে শেষ পর্যন্ত রাস্তাটি বন্ধ করে দিয়েছেন। এখন আমরা মানবেতর জীবনযাপন করছি এবং দ্রুত এর সঠিক সুরাহা দাবি জানাচ্ছি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তিরা বলেন, এই এলাকার তোফাজ্জল হোসেন খান ও ইউসুফ খান দুই ভাই হালিমন বিবির কাছ থেকে ৭৪ শতাংশ জমির মধ্যে ৭০ শতাংশ ক্রয় করেছিলেন। একই দাগে বাকি ৪ শতাংশ জমি থাকায় পরবর্তীতে আরএস রেকর্ডে তোফাজ্জল ও ইউসুফ খান পুরো ৭৪ শতাংশ জমি নিজেদের নামে অন্তর্ভুক্ত করে নেন। রেকর্ড অনুযায়ী ৪ শতাংশ জমি, দুই ভাই ২ শতাংশ করে মালিক হন এবং তোফাজ্জল খান ওই দুই শতাংশ জমির ওপর দিয়ে গ্রামবাসীকে চলাচলের জন্য পায়ে হাঁটার রাস্তাটি দিয়েছিলেন। কিন্তু তার উত্তরাধিকারী সন্তান মোকতার খান বাবার দেওয়া সেই রাস্তাটি বন্ধ করে বর্তমানে স্টিলের গেট নির্মাণ করেছেন। অভিযুক্ত মোকতার খান বলেন, আমাদের বাবার ৩৭ শতাংশ জমির ওপর তিন ভাই বসবাস করছি। পৈতৃক সম্পত্তির অংশ হিসেবে যা পেয়েছি, তার মধ্যেই ঘরবাড়ি তৈরি করেছি। এখন এখানে পায়ে হাঁটার রাস্তা দিলে আমাদের বসবাস করাটাই দুষ্কর হয়ে পড়বে। অভিযুক্ত মোকতার খানের ভাই আকতার খান বলেন, আগে যৌথ পরিবার ছিল, তখন সম্পত্তির কোনো ভাগবাটোয়ারা হয়নি। বাবা মারা যাওয়ার পর তিন ভাই সম্পত্তি বণ্টন করে নিয়েছি। নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা হওয়াতে এখন আমাদের সম্পত্তি কমে গেছে এবং যে যার মতো করে ঘরবাড়ি নির্মাণ করছেন। পায়ে হাঁটার রাস্তাটি দিতে গেলে আমাদের জন্য ঘরবাড়ি তোলা অসম্ভব হয়ে যাবে। মানিকগঞ্জ জজ কোর্টের আইনজীবী খন্দকার সুজন হোসেন বলেন, আইন অনুযায়ী কোনো রাস্তা ২০ বছর বা তার বেশি সময় ধরে সাধারণ মানুষ কোনো বাধা ছাড়া ব্যবহার করে আসলে সেখানে জনসাধারণের ব্যবহারের অধিকার তৈরি হয়। মালিকানা যারই হোক, হঠাৎ করে শতবর্ষের পুরোনো সর্বসাধারণের ব্যবহার্য পথ পৈতৃক সম্পত্তির অজুহাতে বন্ধ করে দেওয়া একটি গুরুতর দেওয়ানি ও ফৌজদারি অপরাধ। সেই ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী নিকটস্থ থানায় সাধারণ ডায়েরি, সংশ্লিষ্ট নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালত বা দেওয়ানী আদালতে মোকদ্দমা দায়ের করে প্রতিকার পেতে পারে। মানিকগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মৌসুমী নাসরিন বলেন, বিষয়টি আমি জেনেছি এবং তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। যেহেতু তারা নিজেদের জমির ওপর দিয়ে রাস্তা দিতে চাচ্ছেন না, সে কারণে ভেতরের পরিবারগুলোকে বিকল্প হিসেবে পাশ দিয়ে রাস্তা করার পরামর্শ দিয়েছি। ওই রাস্তাটি নির্মাণে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে বলেও তাদের আশ্বস্ত করেছি।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button