সম্পাদকীয়

কার্যকর নিয়ন্ত্রণ জরুরি

# ফের লাগামহীন হচ্ছে দ্রব্যমূল্য #

নিত্যপণ্যের বাজার দ্রুত অস্থিতিশীল হয়ে পড়ছে। পাইকারি বা খুচরা উভয় ক্ষেত্রেই দাম লাফিয়ে বাড়ছে। গতকাল বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে বলা হয়, গত তিন মাসে নতুন করে দাম বেড়েছে চাল, ডিম, ভোজ্যতেল, সবজি, মাছ-মাংস, এলপিজি গ্যাসসহ প্রায় সব পণ্যের। এতে নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে। রাজধানীর খুচরা বাজারে গত তিন মাসের ব্যবধানে কয়েকটি সবজির দাম সর্বোচ্চ ১৬৭ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। রান্নায় ব্যবহৃত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৪৩ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। বাজারে পণ্যের দাম বাড়ানোর জন্য অজুহাতের অভাব হয় না। এখন বড় অজুহাত হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ। গত ১৯ এপ্রিল লিটারপ্রতি ডিজেলের দাম বাড়িয়ে ১১৫ টাকা করা হয়। ব্যবসায়ীদের দাবি, এ জন্য পরিবহন খরচ বেড়ে গেছে এবং জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাচ্ছে। আর সে কারণে কি বাজারে ফার্মের মুরগির ডিমের দাম ২২ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে? কিন্তু এই বৃদ্ধি কতটা যৌক্তিক, তা দেখার কোনো উদ্যোগ বা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নেই। পণ্যের দামের ক্ষেত্রে পরিবহন খরচ বৃদ্ধি কত শতাংশ প্রভাব ফেলতে পারে, তা নির্ণয় করা হয় না। ফলে যে যার মতো সুবিধা নিচ্ছে। আবার সবজি ব্যবসায়ীরা বলছেন, বৃষ্টির কারণে সরবরাহ কমেছে এবং পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। ফলে মৌসুমি সবজির উৎপাদন বাড়লেও দাম কমছে না। এ কারণে কাঁচা পেঁপের দাম ১৬৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে? কিংবা বেগুনের দাম কেন ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে? গত বুধবার প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হালনাগাদ ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই) প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৬ সালের এপ্রিলে দেশের গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯.০৪ শতাংশে, যা মার্চে ছিল ৮.৭১ শতাংশ। এই হার মানে গত বছরের এপ্রিল মাসে যে পণ্য বা সেবা ১০০ টাকায় কেনা যেত, তা কিনতে এখন খরচ করতে হচ্ছে ১০৯ টাকা চার পয়সা। ভোক্তারা এলপি গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি পোহাচ্ছে। সম্প্রতি দুই দফায় বাড়ানো হয়েছে এলপি গ্যাসের দাম। এতে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম এক হাজার ৩৫৬ থেকে বেড়ে হয়েছে এক হাজার ৯৪০ টাকা। কিন্তু সেই দামেও সিলিন্ডার পাওয়া যায় না। দোকানগুলোতে দাম নেওয়া হয় দুই হাজার ২০০ টাকার মতো। এভাবে ক্রমাগত দাম বাড়লেও মানুষের আয় কি একই হারে বাড়ছে? না, বাড়ছে না। ফলে মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে এবং কমছে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টির চাহিদা পূরণের ক্ষমতা। আবার অপুষ্টির শরীরে বাড়ছে রোগ-ব্যাধির হানা। শুধু তা-ই নয়, চিকিৎসার ব্যয়ও দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক গবেষণায় উঠে এসেছে, সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বর্তমানে দেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭৯ শতাংশই মানুষকে নিজের পকেট থেকে বহন করতে হচ্ছে। এতে দরিদ্র পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের আয়ের প্রায় ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত স্বাস্থ্য ব্যয়ে চলে যাচ্ছে। অনেক পরিবার চিকিৎসা করাতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। আবার অনেকে অর্থাভাবে চিকিৎসাও নিচ্ছে না। গ্যাস্ট্রিক, রক্তচাপ, বাতজ্বর, হাঁপানি ও ডায়াবেটিসের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভুগলেও ৮০ শতাংশের বেশি মানুষ চিকিৎসা নেয় না বলেও তথ্য পাওয়া যায়। অর্থনীতিবিদ ও ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কার্যকর বাজার তদারকি অত্যন্ত জরুরি। নিত্যপণ্যে কর-ভ্যাট কমাতে হবে। টিসিবি এবং ওএমএস কার্যক্রম বাড়ানোর পাশাপাশি মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button